যশোর প্রতিনিধি
মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নতুন করে জীবন গড়ার সুযোগ তৈরি এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে যশোরে ব্যবসায়িক ও জীবিকায়নের বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের উদ্যোগে, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের অর্থায়নে এবং উইনরক ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় পরিচালিত ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের চলমান কর্মসূচির আওতায় এসব সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে রাইটস যশোরের কনফারেন্স রুমে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মানব পাচার থেকে ফিরে আসা নারী সারভাইভারদের হাতে সেলাই মেশিন, কাপড়সহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
নতুন জীবনের পথে ফেরার প্রত্যয়
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক। প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের যশোর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক অনিরুদ্ধ কুমার রায়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের রিজিওনাল কো-অর্ডিনেটর সুপ্তি দিব্রা। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাইটস যশোরের পরিচালক (কর্মসূচি) প্রদীপ দত্ত এবং ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক এস এম আজহারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সভাপতির বক্তব্যে বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও অতীতের দুঃসহ স্মৃতিকে পেছনে ফেলে নতুন করে জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি সারভাইভারদের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নতুন স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
পরিবার ও সমাজের গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ
প্রধান অতিথি অনিরুদ্ধ কুমার রায় বলেন, বিদেশে নির্যাতন ও নানা ধরনের ক্ষতির শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসার পর অনেক সময় মানব পাচার থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে প্রত্যাশিত গ্রহণযোগ্যতা পান না।
তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি ফিরে আসা ব্যক্তিদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। তাই শুধু দেশে ফিরিয়ে আনা নয়, তাঁদের মানসিক সহায়তা, সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণ এবং জীবিকার সুযোগ তৈরি করাও পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, অতীতের প্রতিকূলতা কাটিয়ে সারভাইভারদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং নিজেদের জীবন নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।
মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রে ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
সেলাই মেশিন, কাপড়সহ ব্যবসার উপকরণ
অনুষ্ঠান শেষে মানব পাচার থেকে ফিরে আসা নারী সারভাইভারদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে সেলাই মেশিন, কাপড়সহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব উপকরণ ব্যবহার করে উপকারভোগীরা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন। বিশেষ করে সেলাই মেশিন ও কাপড়ের মতো উপকরণ কাজে লাগিয়ে ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে তাঁদের পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়াও সহজ হবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
পুনর্বাসনে শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা যথেষ্ট নয়
মানব পাচার থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দেশে ফিরে আসার পর তাঁদের সামনে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে জীবিকার উপকরণ বিতরণের পাশাপাশি কাউন্সেলিং, দক্ষতা উন্নয়ন, আইনি সহায়তা এবং পরিবার ও সমাজে পুনঃএকীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
‘আশ্বাস’ প্রকল্পের মতো কর্মসূচিতে জীবিকার সহায়তা যুক্ত হওয়ায় সারভাইভাররা সরাসরি আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে উপকরণ ব্যবহারের পর তাঁদের আয়, ব্যবসার স্থায়িত্ব এবং সামাজিক পুনর্বাসন কতটা কার্যকর হচ্ছে তার ওপর।
মানব পাচার থেকে ফিরে আসা মানুষকে শুধু ‘উদ্ধারকৃত ব্যক্তি’ হিসেবে না দেখে নতুন জীবন শুরু করতে সক্ষম একজন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যশোরের এই উদ্যোগ সেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করতে পারে।

0 Comments