Header Ads Widget

Responsive Advertisement

নবম পে-স্কেল অনুমোদন: কার বেতন কত বাড়ছে, বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি


নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পেনশন বৃদ্ধি, ‘এক পদ এক পেনশন’ (OROP) এবং বিভিন্ন ভাতার ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন পে-স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে বর্ধিত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা

নতুন পে-স্কেলেও মোট ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে নিম্ন গ্রেডের বেতনে।

২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ

অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে—বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বাড়িয়ে বেতন কাঠামোর ভারসাম্য ও ন্যায্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এক নজরে ২০ গ্রেডের বেতন

গ্রেডপুরোনো মূল বেতননতুন মূল বেতনবৃদ্ধিসরকারি পদের সাধারণ/সম্ভাব্য উদাহরণ*
১ম৳৭৮,০০০৳১,৫৬,০০০১০০%সচিব পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদ ও সমমর্যাদার পদ
২য়৳৬৬,০০০৳১,৩২,০০০১০০%অতিরিক্ত সচিব/সমমর্যাদার পদ
৩য়৳৫৬,৫০০৳১,১৩,০০০১০০%যুগ্ম সচিব/সমমর্যাদার পদ
৪র্থ৳৫০,০০০৳১,০০,০০০১০০%উপসচিব/সমমর্যাদার পদ
৫ম৳৪৩,০০০৳৮৬,০০০১০০%ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা/বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পদ
৬ষ্ঠ৳৩৫,৫০০৳৭১,০০০১০০%সিনিয়র কর্মকর্তা/বিশেষজ্ঞ পদ
৭ম৳২৯,০০০৳৫৮,০০০১০০%বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
৮ম৳২৩,০০০৳৪৬,০০০১০০%সিনিয়র কর্মকর্তা/সমমর্যাদার পদ
৯ম৳২২,০০০৳৪৪,০০০১০০%বিসিএস ক্যাডারের প্রবেশ পদ, সহকারী পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা
১০ম৳১৬,০০০৳৩২,০০০১০০%বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, শিক্ষক ও সমমর্যাদার পদ
১১তম৳১২,৫০০৳২৫,০০০১০০%জুনিয়র কর্মকর্তা/সুপারভাইজরি পদ
১২তম৳১১,৩০০৳২৪,৩০০১১৫.০৪%বিভিন্ন প্রশাসনিক/কারিগরি পদ
১৩তম৳১১,০০০৳২৪,০০০১১৮.১৮%বিভিন্ন প্রশাসনিক/কারিগরি পদ
১৪তম৳১১,০০০৳২৪,০০০১১৮.১৮%কারিগরি/প্রশাসনিক পদ
১৫তম৳৯,৭০০৳২৩,৫০০১৪২.২৭%বিভিন্ন সহকারী/কারিগরি পদ
১৬তম৳৯,৩০০৳২১,৯০০১৩৫.৪৮%উচ্চমান সহকারী, হিসাব সহকারীসহ বিভিন্ন পদ
১৭তম৳৯,০০০৳২১,৪০০১৩৭.৭৮%সহকারী/কারিগরি পর্যায়ের বিভিন্ন পদ
১৮তম৳৮,৮০০৳২১,০০০১৩৮.৬৪%বিভিন্ন সহায়ক/কারিগরি পদ
১৯তম৳৮,৫০০৳২০,৫০০১৪১.১৮%নিম্ন পর্যায়ের বিভিন্ন সহায়ক পদ
২০তম৳৮,২৫০৳২০,০০০১৪২.৪২%অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পদ

পদগুলোর উদাহরণ: একই পদ বিভিন্ন দপ্তর, নিয়োগবিধি, ক্যাডার ও পদোন্নতি কাঠামোর কারণে ভিন্ন গ্রেডে থাকতে পারে। তাই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত গ্রেডই চূড়ান্ত।

সবচেয়ে বেশি বাড়ল কোন গ্রেডে?

শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ২০তম গ্রেডে। ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে ২০ হাজার টাকা হওয়ায় বৃদ্ধি প্রায় ১৪২.৪২ শতাংশ।

এর কাছাকাছি রয়েছে—

  • ১৫তম গ্রেড: ১৪২.২৭%
  • ১৯তম গ্রেড: ১৪১.১৮%
  • ১৮তম গ্রেড: ১৩৮.৬৪%
  • ১৭তম গ্রেড: ১৩৭.৭৮%
  • ১৬তম গ্রেড: ১৩৫.৪৮%

অন্যদিকে ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে নতুন মূল বেতন পুরোনো মূল বেতনের ঠিক দ্বিগুণ করা হয়েছে, অর্থাৎ বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ।

৯ম গ্রেডে বেতন ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার

সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের কাছে বহুল আলোচিত ৯ম গ্রেডে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাডার ও সরকারি দপ্তরের প্রবেশ পর্যায়ের কর্মকর্তা পদে এই গ্রেড গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নির্দিষ্ট কোনো পদ কোন গ্রেডে থাকবে, সেটি সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল।

১০ম গ্রেডেও দ্বিগুণ মূল বেতন

১০ম গ্রেডের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, কারিগরি পেশাজীবী ও সমমর্যাদার কিছু পদ এই গ্রেডের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মূল বেতনের বাইরে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা থাকায় একজন কর্মচারীর মোট মাসিক প্রাপ্তি শুধু এই মূল বেতনের সমান নয়।

১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি

নতুন কাঠামোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে পুরোনো মূল বেতনের তুলনায় ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।

বিশেষ করে ১৫তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩৫ থেকে ১৪২ শতাংশের মধ্যে। সরকারি সিদ্ধান্তে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু বেতন নয়, মোবাইল ভাতাতেও পরিবর্তন

নতুন বেতন কাঠামোয় ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে যেখানে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট সুবিধা ছিল, নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতার সিদ্ধান্তও রয়েছে।

একসঙ্গে নয়, তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন

নতুন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও সরকারি কর্মচারীরা পুরো বর্ধিত মূল বেতন একবারে পাবেন না।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

অন্যদিকে বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় এই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পেনশনেও বড় পরিবর্তন

নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির হার হবে—

  • ৯ হাজার টাকা বা কম: ১০০ শতাংশ

  • ৯,০০১–২০,০০০ টাকা: ৭৫ শতাংশ

  • ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা: ৬৫ শতাংশ

  • ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা: ৬০ শতাংশ

  • ৪০,০০১ টাকা বা বেশি: ৫৫ শতাংশ

অর্থাৎ তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের জন্য বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।

১২ বছর পর বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়েনি। সাধারণত পাঁচ বছর পরপর বেতন কাঠামো পরিবর্তনের কথা থাকলেও এবার প্রায় ১২ বছর পর নতুন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে।

তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন চলতি সপ্তাহে জারি হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক প্রজ্ঞাপন এবং আইনগত ভেটিং শেষে কিছু বিষয় এসআরও আকারেও জারি করা হবে।

মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানালেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়তে পারে।

তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বেসরকারি খাতেও বেতন কাঠামো নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় জনবল কমানো গেলে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

সরকারের বাড়তি ব্যয় কত?

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, পেনশন বৃদ্ধি, ‘এক পদ এক পেনশন’ এবং অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে।

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এত বড় অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে—এ বিষয়টিও নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

এক নজরে নতুন পে-স্কেল

নতুন স্কেল: জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬
গ্রেড: ২০টি
সর্বনিম্ন মূল বেতন: ২০,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ মূল বেতন: ১,৫৬,০০০ টাকা
সর্বনিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধি: প্রায় ১৪২%
সর্বোচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধি: ১০০%
কার্যকর ধরা হয়েছে: ১ জুলাই ২০২৬
মূল বেতন বাস্তবায়ন: তিন ধাপে
ভাতা: ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে
পেনশন বৃদ্ধি: ৫৫% থেকে ১০০%
সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয়: প্রায় ১,০৫,৫৮০ কোটি টাকা

Post a Comment

0 Comments