Header Ads Widget

Responsive Advertisement

যাদুকাটা সচল হলে ফিরবে বাদাঘাটের প্রাণ, কর্মসংস্থান ফেরার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা


বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে স্থবির নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, চাপে শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা; পরিবেশ রক্ষা করে বৈধ কর্মসংস্থান চালুর দাবি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীকে ঘিরে একসময় কর্মব্যস্ত থাকত বাদাঘাট বাজারের কালীবাড়ি রোড। নদীতে বারকি নৌকার আনাগোনা, বালু-পাথর পরিবহন, শ্রমিকদের ব্যস্ততা আর ব্যবসায়ীদের বেচাকেনায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ বা সীমিত থাকায় সেই কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।

নদীকেন্দ্রিক কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় শুধু বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরাই নন, প্রভাব পড়েছে নৌকার মাঝি, পরিবহনকর্মী, দোকানদার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবিকায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নদীর পরিবেশ ও তীরবর্তী জনপদ রক্ষা করে আইনসম্মতভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বাদাঘাট বাজারে।

তবে যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি সচল করার প্রশ্নে কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আদালতের নির্দেশনা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনার দাবি উঠেছে।

যাদুকাটা নদীর সঙ্গে জড়িয়ে হাজারো মানুষের জীবিকা

তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক জলধারা নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী থেকে বালু-পাথর সংগ্রহ, নৌকায় পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানো এবং বাজারে সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।

নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শ্রমিক, বারকি নৌকার মাঝি, পরিবহনশ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত। নদীতে কাজের সুযোগ থাকলে তাঁদের আয় বাড়ে, আর সেই আয় স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবা কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীতে কাজ বন্ধ বা সীমিত হলে এই পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। শ্রমিকদের আয় কমলে তাঁদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন বাজারের মুদি দোকানদার, খাবারের দোকান, চায়ের স্টল, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ ছোট উদ্যোক্তারা।

জেলা প্রশাসনের পর্যটনবিষয়ক তথ্যে যাদুকাটা নদীতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই সংখ্যা নদীটির কর্মসংস্থানগত গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে এটি বর্তমান সময়ে কর্মরত শ্রমিকের যাচাইকৃত সংখ্যা নয়; প্রকৃত সংখ্যা জানতে হালনাগাদ জরিপ প্রয়োজন।

বাদাঘাট বাজারে কমেছে কর্মচাঞ্চল্য

যাদুকাটা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র বাদাঘাট বাজার। নদীতে কাজের সুযোগ থাকলে শ্রমিকেরা বাজারে কেনাকাটা করেন, নৌকার মাঝিরা বিভিন্ন সেবা নেন এবং পরিবহনকর্মীদের আনাগোনায় স্থানীয় ব্যবসা সচল থাকে।

কিন্তু নদীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিলে বাজারের এই স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হয়। স্থানীয়দের মতে, কালীবাড়ি রোডসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নদীতে নিয়মিত কাজ না থাকলে শ্রমিকদের পক্ষে সংসারের খরচ চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ও কমে যায়।

এভাবে নদীতে কর্মসংস্থানের সংকট শুধু একটি পেশার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি

যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে এর আগেও দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর আদালতের রায়ে যাদুকাটা নদী ও সংশ্লিষ্ট বালুমহালে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন ঘিরে আইনি বিরোধ, অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ এবং পরিবেশগত ক্ষতির প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে।

২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতির কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ ও পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ পরিস্থিতিতে নদীকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান কবে এবং কী শর্তে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ

যাদুকাটা নদীকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীর তীর কেটে ফেলা এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর ২৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এটি সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের তথ্য; অভিযুক্তদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নয়।

নদীর তীর নির্বিচারে কাটা হলে তীরবর্তী বসতি, কৃষিজমি ও স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা থাকে।

তাই শুধু বালু-পাথর উত্তোলন চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। কোথায়, কী পরিমাণে এবং কোন পদ্ধতিতে উত্তোলন করা যাবে, তা আইন ও পরিবেশগত শর্ত অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি।

শ্রমিকদের জীবিকা ও নদী রক্ষা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন

যাদুকাটা নদীর কর্মসংস্থান বন্ধ বা সীমিত থাকলে শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। অন্যদিকে, পরিবেশগত ক্ষতি হয় এমনভাবে বালু-পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে নদী ও তীরবর্তী জনপদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।

তাই বিষয়টিকে শুধু উত্তোলন চালু বা বন্ধ রাখার বিতর্ক হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নদীর পরিবেশগত অবস্থা, বৈধ উত্তোলনযোগ্য এলাকা, তীরবর্তী বসতির ঝুঁকি এবং প্রকৃত শ্রমিকের সংখ্যা বিবেচনায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং বৈধ কার্যক্রমের শর্ত স্পষ্ট করা জরুরি।

একই সঙ্গে কাজ বন্ধ থাকার কারণে যেসব শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়েছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা-ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments