রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক সমাবেশের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় ওই গ্রাফিতির সামনে ‘যে কবি জনতার’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও প্রতিবাদী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
উদীচীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রকাশের ওপর আঘাতের প্রতিবাদ জানানো হবে।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, ক্ষোভ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে
সেগুনবাগিচার দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর ঘটনায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনাটিকে শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছে উদীচী।
সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন কবি নন; বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
উদীচীর ভাষ্য, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর ঘটনা শুধু একটি গ্রাফিতি নষ্ট করার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মানের একটি দৃষ্টান্ত। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘যে কবি জনতার’—কী থাকছে কর্মসূচিতে?
উদীচীর আয়োজিত ‘যে কবি জনতার’ শীর্ষক কর্মসূচিতে সংগঠনটির শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
উদীচী জানিয়েছে, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মুক্তচিন্তা এবং মানুষের সৃজনশীল প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হবে।
কেন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ?
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান অনন্য। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও চিত্রকলাসহ সৃজনশীলতার বহু ক্ষেত্রে তাঁর কাজ বাংলা সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলা সাহিত্যকে পরিচিত করে তোলেন। তাঁর রচিত ‘জন গণ মন’ ভারতের জাতীয় সংগীত এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে।
ফলে রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য বা শিল্পকর্মকে ঘিরে বিতর্ক সাধারণ কোনো শিল্পকর্মের প্রশ্নের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে ঐতিহাসিক মূল্যায়নও একমাত্রিক নয়। তাঁর সাহিত্যিক অবদান নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও জমিদারি পরিচালনা, সমাজচিন্তা, জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতার প্রতি তাঁর অবস্থান এবং সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্কে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও মতভেদ রয়েছে। এসব ঐতিহাসিক বিতর্কের সঙ্গে কোনো শিল্পকর্মে কালি মাখানোর ঘটনাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
গ্রাফিতি ও জনপরিসরের শিল্প
ঢাকার দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য প্রকাশের অন্যতম দৃশ্যমান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে ইতিহাস, রাজনীতি, সামাজিক বৈষম্য, মুক্তচিন্তা এবং নাগরিক আকাঙ্ক্ষার নানা বিষয় প্রকাশ করা হয়।
এ কারণে কোনো গ্রাফিতি নষ্ট করা বা বিকৃত করার ঘটনা কেবল একটি দেয়ালের চিত্র নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে শিল্পীর সৃজনশীল স্বাধীনতা, জনপরিসরে শিল্পচর্চা এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
অন্যদিকে, কোনো শিল্পকর্ম বা ব্যক্তিত্বকে ঘিরে মতভিন্নতা থাকলে তার প্রকাশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক পথ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সমালোচনা, বিতর্ক, আলোচনা বা বিকল্প শিল্পকর্মের মাধ্যমে মত প্রকাশ এবং কোনো শিল্পকর্ম নষ্ট করা—এই দুই পদ্ধতি এক নয়।
উদীচীর অবস্থান
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠন। রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর ঘটনায় সংগঠনটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ‘যে কবি জনতার’ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শুধু রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর প্রতিবাদ নয়; একই সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য, মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীল প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরা।

0 Comments