Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বগুড়ায় তিন দশক ধরে লোকজ সংস্কৃতির সুর, জোতদার বাউল মুকুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অনন্য উদ্যোগ


সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া

আধুনিক বিনোদন, ডিজিটাল মাধ্যম ও বহুমুখী সাংস্কৃতিক প্রবাহের ভিড়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ও বাউলচর্চা অনেক জায়গাতেই আগের মতো নিয়মিত নেই। এমন বাস্তবতায় বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদে তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিকড়ের সংস্কৃতি ধরে রাখার কাজ করে যাচ্ছে ‘জোতদার বাউল মুকুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’।

“মাটির গান আমাদের প্রাণ”—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে সংগঠনটি স্থানীয় শিল্পীদের সংগঠিত করা, নিয়মিত গান ও বাদ্যযন্ত্রের চর্চা এবং নতুন প্রজন্মকে লোকসংগীতের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

১৯৯৩ সালে পথচলা

বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার ভেলুরপাড়া ডাকঘরের অধীন হলিদাবগা (জোতদার বাড়ি) গ্রামে ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জোতদার বাউল মুকুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী।

স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী জোতদার এম. নুরুজ্জামান বাদল সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল এলাকার লোকজ গান, বাউলসংগীত ও গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চাকে সংগঠিত করা এবং স্থানীয় শিল্পীদের জন্য একটি নিয়মিত সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাউল ও লোকজ গানের শিল্পীদের একত্রিত করে চর্চার পরিবেশ তৈরি করে আসছে।

দোতারা-ঢোলের সুরে নিয়মিত মহড়া

সংগঠনটির নিজস্ব কার্যালয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি। তবলা, ঢোল, দোতারা ও হারমোনিয়াম ঘিরে স্থানীয় শিল্পীদের নিয়মিত মহড়া চলে।

শিল্পীরা দলবদ্ধভাবে গান অনুশীলন করেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের তরুণদের বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও বাউলগানের সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

শুধু গান পরিবেশন নয়—একটি লোকজ সাংস্কৃতিক ধারাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি। স্থানীয় সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষক সজল মাহমুদের সহযোগিতায় সংগঠনটির কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ডিজিটাল যুগে লোকসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ

বর্তমান সময়ে মানুষের বিনোদনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও ও বিভিন্ন ধরনের আধুনিক বিনোদন সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামীণ সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে আগ্রহ কমছে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন দেশীয় লোকসংগীতের পাশাপাশি নানা ধরনের বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একসময় গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকা বাউলগান, পালাগান, ভাটিয়ালি কিংবা অন্যান্য লোকজ সংগীতচর্চা অনেক এলাকায় আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না।

এই বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

তরুণদের সম্পৃক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শুধু প্রবীণ শিল্পীদের চর্চা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের শিল্পী তৈরি করা।

জোতদার বাউল মুকুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় তরুণদের লোকসংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের চর্চায় সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা। এতে একদিকে শিল্পীদের নতুন প্রজন্ম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অন্যদিকে একটি অঞ্চলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যও ধরে রাখা সম্ভব হয়।

সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা

স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী ও বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, সোনাতলার মতো জনপদে দীর্ঘ সময় ধরে লোকসংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ।

তাদের মতে, লোকসংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে একটি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, ইতিহাস, সামাজিক সম্পর্ক, আবেগ ও মূল্যবোধের সম্পর্ক রয়েছে। তাই গ্রামীণ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় রাখা গেলে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।

পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা

সংগঠনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা পাওয়া গেলে তাদের কার্যক্রমকে বৃহত্তর পরিসরে নেওয়া সম্ভব হবে।

তাদের প্রত্যাশা—নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থা, শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও পরিবেশনার সুযোগ এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে সোনাতলার এই লোকজ চর্চাকে বগুড়া জেলার বাইরেও পরিচিত করা।

লোকগান হারিয়ে গেলে শুধু কিছু গান হারাবে না—হারিয়ে যেতে পারে একটি জনপদের স্মৃতি, ভাষার নিজস্বতা ও জীবনঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সেই জায়গা থেকে ‘জোতদার বাউল মুকুল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’র দীর্ঘদিনের চর্চা স্থানীয় লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Post a Comment

0 Comments