ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির পার্থক্য কোথায়—এমন প্রশ্ন তুলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন। তাঁর পোস্টে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারার মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক তুলনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
নুরুল হক নুর তাঁর পোস্টে লেখেন, “ভারতের বিজেপি, আরএসএস আর বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে?”
তাঁর এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দুই দেশের ভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর আদর্শ, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।
দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা
নুরের পোস্টের প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) এবং আন্দোলনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এ কর্মসূচিতে যুক্ত ছিল।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি কিছু এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের খবর পাওয়া যায়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
তবে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অভিযোগ এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের অবস্থানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না; একইভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বিক্ষোভে আটক নিয়ে বিতর্ক
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে তিন হাজারের বেশি মানুষকে আটকের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
একই ঘটনায় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীসহ কয়েকজনের পুলিশি হেফাজতে থাকার খবরও প্রকাশিত হয়। তবে কারা কতক্ষণ আটক ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের আইনি অবস্থান কী ছিল—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কও সামনে এসেছে।
বিজেপি-আরএসএস ও জামায়াত-শিবির: তুলনার ভিত্তি কী?
নুরুল হক নুরের প্রশ্নটি মূলত দুই দেশের ধর্মভিত্তিক বা ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্যে তুলনার প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। তবে বিজেপি, আরএসএস, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে একই ধরনের সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করার আগে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
ভারতের বিজেপি একটি রাজনৈতিক দল, যা নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে আরএসএস একটি স্বতন্ত্র সংগঠন, যার সঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে। হিন্দুত্বের ধারণা ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। ইসলামী ছাত্রশিবির একটি ছাত্রসংগঠন, যা জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের বিজেপি-আরএসএসের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়।
তাই তুলনাটি করতে হলে শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা আদর্শিক সাদৃশ্য বিবেচনা করলেই চলবে না। বরং দেখতে হবে—সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রচিন্তা কী, সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে তাদের অবস্থান কী, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এবং ক্ষমতায় থাকলে বা বিরোধী অবস্থানে থাকলে তারা কী ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে।
ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া সব রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শ, কর্মপদ্ধতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা এক নয়। কোনো সংগঠনের প্রকৃতি নির্ধারণে তার ঘোষিত নীতি, বাস্তব কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক কাঠামো এবং ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ কারণে বিজেপি-আরএসএস ও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে তুলনা করতে গেলে আদর্শিক মিলের পাশাপাশি মৌলিক পার্থক্যগুলোও তুলে ধরা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য, অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা বজায় রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নুরের প্রশ্নটি রাজনৈতিক আলোচনার একটি বিষয় সামনে এনেছে। তবে বিজেপি-আরএসএস ও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে প্রকৃত সাদৃশ্য ও পার্থক্য নির্ধারণ করতে হলে আবেগনির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে ইতিহাস, আদর্শ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নীতিগত অবস্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

0 Comments