যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। পরবর্তী কয়েক মাসে আরও কয়েক দফায় জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন। তার আগে ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষক, পণ্য পরিবহনকারী, ট্রাকচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম কমানোর চাপও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কতটা স্বস্তি ফিরবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা সাময়িকভাবে বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে; কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু রাশিয়ার ডিজেল দিয়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো কঠিন হতে পারে।
রাশিয়া থেকে কত ডিজেল পাবে যুক্তরাষ্ট্র?
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে রাশিয়া ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে ১০ লাখ টন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে স্বল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অর্থাৎ, ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কয়েক ধাপে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রুশ ডিজেল আসতে পারে। তবে সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি, আমদানির মূল্য, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তির অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
রাশিয়ার পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানি পণ্য সরবরাহের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। মস্কোর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের আলোচনায় জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও উঠে এসেছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল, রুশ জ্বালানি আমদানিতে নতুন সুযোগ
রাশিয়ার সঙ্গে এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতির সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কোর জ্বালানি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার জ্বালানি আয় সীমিত করে দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা কমানো।
কিন্তু ডিজেলের সরবরাহসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন রুশ জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় রুশ ডিজেল সরবরাহের জন্য একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ঘোষিত ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে রুশ ডিজেল সরবরাহের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগে ছাড় দেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানির বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও এর কূটনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র এত দিন অনুসরণ করেছে, নতুন উদ্যোগটি তার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
কেন বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম?
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি পরিবহনের পথে বিঘ্ন বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে চাপ তৈরি করেছে।
একই সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাণিজ্যিক সরবরাহে অনিশ্চয়তাও বাজারকে প্রভাবিত করছে।
ডিজেল শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর জ্বালানি নয়। কৃষিকাজ, ট্রাক পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচে চাপ পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন অটোমোবাইল সংগঠন এএএ-এর তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের জাতীয় গড় দাম ছিল ৬ দশমিক ২৮ ডলার। এর আগে সেপ্টেম্বরে দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে উঠেছিল। এই উচ্চমূল্যই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়িয়েছে।
চুক্তির ঘোষণার পর বাজারে কী প্রতিক্রিয়া?
রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল ফিউচারসের দামে তাৎক্ষণিক পতন দেখা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘোষণার পর ডিজেল ফিউচারসের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমেছিল।
বাজারের এই প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনাকে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তবে ফিউচারসের দাম কমে যাওয়া আর সাধারণ ভোক্তার জন্য পাম্পে ডিজেলের দাম কমে যাওয়া এক বিষয় নয়।
জ্বালানির চূড়ান্ত মূল্য নির্ভর করে আমদানির খরচ, শোধনাগারের সক্ষমতা, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়, সরবরাহের সময় এবং আঞ্চলিক চাহিদার ওপর। ফলে বাজারে ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সাধারণ ক্রেতারা কত দ্রুত এবং কতটা কম দামে ডিজেল পাবেন, তা নির্ভর করবে বাস্তব সরবরাহের ওপর।
রাশিয়ার জন্যও কি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ?
এই উদ্যোগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারের জন্য নয়, রাশিয়ার অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং রপ্তানি বিধিনিষেধ রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে চাপে রেখেছে।
নতুন সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে রাশিয়া অতিরিক্ত ডিজেল বিক্রি করে আয় বাড়াতে পারে। এই আয় দেশটির সরকারি রাজস্ব ও জ্বালানি খাতকে সহায়তা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে রাশিয়ার নিজস্ব বাজারেও ডিজেলের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
রাশিয়া আগে বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু শোধনাগারে হামলা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপে দেশটি সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ইউক্রেনের ক্ষোভ, পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা দিতে পারে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি আয় সীমিত করার বদলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে মস্কোর ওপর চাপ কমে যেতে পারে।
এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কমানো এবং অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার প্রয়োজন; অন্যদিকে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া এবং রাশিয়ার যুদ্ধকালীন আয় সীমিত রাখার কূটনৈতিক লক্ষ্য।
ফলে এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু জ্বালানির বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা নীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের আগে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দাম?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোটারদের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ করে কৃষক, ট্রাকচালক, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই ব্যয়ের অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। ফলে জ্বালানির মূল্যস্ফীতি বৃহত্তর জীবনযাত্রার ব্যয়কেও প্রভাবিত করে।
ট্রাম্প প্রশাসন ডিজেলের দাম কমানোর উদ্যোগকে কৃষক, খামারি ও ট্রাকচালকদের স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবে কত জ্বালানি বাজারে আসে এবং তার প্রভাব কত দিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
নির্বাচনের আগে দাম কমানোর রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও শুধু একটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ চুক্তি দিয়ে মূল্যস্ফীতির সব কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

0 Comments