বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। আর্থিক অনিয়ম ও তথ্য গোপনসহ একাধিক অভিযোগের মধ্যে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) তিনি পদত্যাগ করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
২০২৪ সালে পাঁচ বছরের জন্য WHO-এর এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। তবে পরবর্তী সময়ে তাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক অভিযোগ ও তদন্ত সামনে আসে।
কী কী অভিযোগ উঠেছে?
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, WHO সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে—
চীন সফরের খরচ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে জমি দখলের অভিযোগ
বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা
তবে এসব অভিযোগের সবকটিই সায়মা ওয়াজেদ অস্বীকার করেছেন।
চীন সফরের খরচ নিয়ে কী অভিযোগ?
সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন সফরের খরচ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি কোনো ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি নয়; বরং খরচ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর করা প্রশাসনিক ভুলের কারণে সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল।
তার আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
সায়মা ওয়াজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নিয়েও WHO-এর তদন্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ বলেছেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং এ বিষয়ে WHO মহাপরিচালককে তিনি অবহিত করেছিলেন।
জমি নিয়ে অভিযোগের জবাব কী?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগও WHO-এর পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছিল।
তবে সায়মা ওয়াজেদের বক্তব্য, WHO-তে যোগদানের আগেই তিনি ওই জমির মালিক হন। তার দাবি, বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় তিনি ওই সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন।
কেন পদত্যাগ করলেন সায়মা ওয়াজেদ?
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ অভিযোগ করেছেন, WHO-তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে বেতন বা পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তার আর্থিক পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে উঠেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, এসব পরিস্থিতির কারণে WHO মহাপরিচালকের নেতৃত্বের ওপর তার আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আগে থেকেই ছিল অপসারণের আলোচনা?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও আগে আলোচনা চলছিল।
একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, WHO আগামী ১২ অক্টোবর আঞ্চলিক পরিচালকের পদের জন্য মনোনয়ন ঘোষণা করতে পারে। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই-বাছাই এবং আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
WHO-এর গুরুত্বপূর্ণ পদ কেন?
WHO-এর আঞ্চলিক পরিচালকরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে WHO-এর নীতিকে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতও রয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটের মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন।
এক নজরে
পদ: WHO দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক
পদত্যাগ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দায়িত্ব গ্রহণ: ২০২৪ সালে
অভিযোগ: আর্থিক অনিয়ম, তথ্য/যোগ্যতা সংক্রান্ত প্রশ্ন ও জমি নিয়ে অভিযোগ
সায়মা ওয়াজেদের অবস্থান: অভিযোগগুলো অস্বীকার
পরবর্তী নির্বাচন: আগামী ২৪ জানুয়ারি আয়োজনের পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। অভিযোগগুলোর পাশাপাশি তার নিজের ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। এখন নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে নজর থাকবে।
0 Comments