ভারতের উচ্চশিক্ষা, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন; বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কবার্তা—প্রচার নয়, যাচাই করেই সিদ্ধান্ত
বিশ্লেষণাত্মক কলামিস্ট: টি আর শাওন
ভারতে উচ্চশিক্ষা, বিশ্বমানের শিক্ষা, মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং বড় চাকরির বাজার—এই আকর্ষণীয় বার্তা সামনে রেখে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা এক্সপো, বিশ্ববিদ্যালয় মেলা ও বিদেশে পড়াশোনার প্রচারণা চলছে। এসব আয়োজনে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়, স্কলারশিপ, ভর্তি-সুযোগ ও ক্যারিয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো—কেবল আকর্ষণীয় ব্রোশার, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল উপস্থাপনা দেখেই কি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত? নাকি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব পরিসংখ্যানও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার?
ভারতের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র কী বলছে?
উৎসপাঠে উদ্ধৃত Azim Premji University-এর ‘State of Working India 2026’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ স্নাতকের মধ্যে আনুমানিক ১ কোটি ১০ লাখ বেকার ছিলেন। একই বয়সী বেকারদের মধ্যে স্নাতকদের অংশ ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ ওই শ্রেণির বেকারদের প্রায় প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজনেরই স্নাতক ডিগ্রি ছিল।
প্রতিবেদনটির উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের ক্ষেত্রেও এই হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ।
গত কয়েক দশকে ভারতে স্নাতকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৮৩ সালে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫০ লাখ; ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছায়। কিন্তু স্নাতকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি—এটাই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
উৎসপাঠে আরও বলা হয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ লাখ স্নাতক কর্মশক্তিতে যুক্ত হলেও employed graduates-এর সংখ্যা বেড়েছে আনুমানিক ২৮ লাখ করে এবং salaried employment পেয়েছেন প্রায় ১৭ লাখ স্নাতক।
মূল প্রশ্ন: ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি দক্ষতা ও মানসম্মত চাকরির সুযোগও বাড়ছে?
শুধু ডিগ্রি নয়, Education থেকে Jobs পর্যন্ত পুরো পথ গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সাধারণভাবে স্নাতকরা অ-স্নাতকদের তুলনায় বেশি আয় করার সুযোগ পান। কিন্তু একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা ডিগ্রিধারীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে—শিক্ষা কি দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, দক্ষতা কি চাকরির বাজারে মূল্য পাচ্ছে এবং পড়াশোনা শেষে স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না।
শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের এই ধারাটি কার্যকরভাবে যুক্ত না হলে একটি ডিগ্রি শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না। তাই বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু কোর্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়, গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থান, ইন্টার্নশিপ, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ এবং ডিগ্রির শ্রমবাজারে মূল্যও যাচাই করা জরুরি।
Merit, reservation ও fair competition নিয়ে বিতর্ক
ভারতের reservation বা quota system দেশটির দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল নীতি। এর পেছনে সামাজিক ন্যায়বিচারের যুক্তি রয়েছে এবং ভারতীয় সমাজে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও আছে।
একই সঙ্গে মেধা, সুযোগের সমতা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং fair competition নিয়েও ভারতের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও আন্দোলন হয়েছে। প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি পরীক্ষার সমস্যা থাকে না; এটি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।
তবে এসব বিষয় আলোচনা করার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কোনো দেশের নীতি বা সমস্যা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন—কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীকে ছোট করা নয়।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কী কী প্রশ্ন করা উচিত?
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনা করা বা ভারতে যাওয়ার বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। যেখানে ভালো শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক দক্ষতা অর্জন এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ আছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই আবেদন করতে পারেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষা এক্সপোর প্রচারণাকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অন্তত নিচের বিষয়গুলো লিখিতভাবে জেনে নেওয়া উচিত:
•বিশ্ববিদ্যালয়টি কোন কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত এবং তার র্যাংকিং বা একাডেমিক অবস্থান কী?
•কোর্সটির প্রকৃত মান, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষকতার মান কেমন?
•টিউশন ফি, আবাসন, খাবার, স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় কত?
•স্কলারশিপ কতজন শিক্ষার্থী পায় এবং যোগ্যতার শর্ত কী?
•পড়াশোনা শেষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের বাস্তব সুযোগ কতটা?
•গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থানের হার কত এবং সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস কী?
•ডিগ্রিটির বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে মূল্য কতটা?
•ভিসা, ইন্টার্নশিপ, পার্ট-টাইম কাজ ও স্নাতকোত্তর কর্মসংস্থানের নিয়ম কী?
•প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব শিক্ষার্থী-অভিজ্ঞতার মিল কতটা?
ভারতের ভালো দিক থেকে শেখা, সমস্যাগুলো থেকেও সতর্ক হওয়া
ভারতের শিক্ষা ও শিল্পখাতের ভালো দিকগুলো থেকে বাংলাদেশ শিখতে পারে। একইভাবে, ভারতের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলোও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। কোনো দেশের সাফল্যের গল্পকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সমস্যা তুলে ধরে সেই দেশকে একতরফাভাবে ছোট করাও সমাধান নয়।
মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া। কারণ একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কোনো Education Expo-এর marketing campaign নয়; সেটি নির্ভর করে শিক্ষা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, বাস্তব দক্ষতা, প্রকৃত চাকরির সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সম্ভাবনার ওপর।
শেষ কথা
ভারত যখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের Quality Education ও Career Opportunity-এর আকর্ষণীয় বার্তা দিচ্ছে, তখন ভারতের নিজস্ব তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্রও একই সততার সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
প্রচার নয়, তথ্য দেখুন। পরিসংখ্যান দেখুন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সের বাস্তব মান যাচাই করুন। কর্মসংস্থানের রেকর্ড দেখুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ—সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
0 Comments