কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান এবং গাজীপুরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পৃথক প্রজ্ঞাপনে তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এস এম মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এস এম মেহেদী হাসান ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাকে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা এবং ই-মেইলে নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কাজে ফেরেননি।
তার বিরুদ্ধে বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৯ জুন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং অভিযোগনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কোনো জবাব দেননি এবং সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি তদন্তের জন্য ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। এরপর চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ডের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের পরামর্শ নেওয়া হলে কমিশনও বরখাস্তের শাস্তি দেওয়ার পক্ষে মত দেয়।
রহমত উল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ
অপর কর্মকর্তা মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী গাজীপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এ কর্মরত ছিলেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অসুস্থতার কারণে চিকিৎসক তাকে দুই মাস বিশ্রামের পরামর্শ দেন।
বিশ্রাম শেষে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আর কর্মস্থলে যোগ দেননি। কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এবং কর্মস্থলে ফিরে আসার জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় একাধিক নোটিশ পাঠায়। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, অসদাচরণ এবং ‘পলায়ন’-এর অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
সরকারি কর্মকমিশনের পরামর্শের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রেই বিভাগীয় তদন্তের পর চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ডের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি সরকারি কর্মকমিশনের পরামর্শের জন্য পাঠানো হলে কমিশন তাদের বিরুদ্ধে বরখাস্তের শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে বলে মত দেয়।
এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশাসনিক বার্তা
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সরকারি চাকরিতে কর্মস্থলে উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন এবং বিভাগীয় শৃঙ্খলার গুরুত্বকে সামনে এনেছে।
সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সাধারণত অভিযোগ, কারণ দর্শানোর সুযোগ, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত—এ ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও দুই কর্মকর্তাকে একাধিকবার জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

0 Comments