জাতীয় ডেস্ক:
বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান চারটি পেনশন স্কিমের পাশাপাশি আলাদা পঞ্চম কোনো স্কিম হিসেবে নয়, বরং প্রতিটি স্কিমের শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ হিসেবে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে যারা প্রচলিত সুদভিত্তিক কাঠামোতে অংশ নিতে চান না, তাদের জন্য বিকল্প তৈরি হবে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো ও বিনিয়োগ পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে হবে।
চার স্কিমেই থাকবে শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে সমতা, সুরক্ষা, প্রবাস ও প্রগতি—এই চারটি স্কিম রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রতিটি স্কিমের অধীনেই শরিয়াহভিত্তিক একটি বিকল্প রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন গ্রাহক চাইলে প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন, আবার শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতেও অংশ নিতে পারবেন।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের একজন সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি আলাদা পঞ্চম স্কিম নয়; বিদ্যমান চার স্কিমেরই ইসলামিক ভার্সন হিসেবে এটি চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কেন নতুন এই উদ্যোগ?
২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর পর এখন পর্যন্ত চারটি স্কিমে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে সমতা স্কিমে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও বাকি তিনটি স্কিমে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।
এ অবস্থায় আরও বেশি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে পেনশন ব্যবস্থায় পণ্যের বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব অনুমোদনের পর এর আইনগত ভিত্তি তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
টাকা কোথায় বিনিয়োগ হবে?
প্রস্তাবিত শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—গ্রাহকের জমা করা অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হবে।
প্রচলিত পেনশন তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় করে। কিন্তু শরিয়াহভিত্তিক তহবিলে সুদভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে না।
এ কারণে সুকুক, শরিয়াহসম্মত শেয়ার বা ইসলামিক ইক্যুইটি এবং মুদারাবা বা মুশারাকার মতো বিনিয়োগ কাঠামো ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
শরিয়াহ বোর্ড ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় গ্রাহকের আস্থা তৈরির জন্য বিনিয়োগ কোথায় হচ্ছে, কীভাবে মুনাফা নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং শরিয়াহ নীতিমালা কীভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আলাদা শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হবে কি না, নাকি বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া হবে—এ বিষয়গুলোও এখন পর্যালোচনায় রয়েছে।
পেনশনে আরও কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ
শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে আরও কিছু সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী আগে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই বয়সসীমা ৮০ বছর করার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, তহবিল থেকে ঋণের সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ
সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত হলে এমন একটি জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প তৈরি হতে পারে, যারা সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী। ফলে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পরিধি বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নতুন একটি পদ্ধতি ঘোষণা করলেই এর কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে না। শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পর্যাপ্ত ক্ষেত্র, স্বচ্ছ মুনাফা ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন তদারকি, নিয়মিত অডিট এবং গ্রাহকের আস্থা—সবগুলো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিশেষ করে বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের বাজার এখনো সীমিত। তাই দীর্ঘমেয়াদে পেনশন তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও শরিয়াহসম্মতভাবে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সবশেষে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি এখনো আইনগত ও কাঠামোগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে বাস্তবে কবে থেকে এটি চালু হবে এবং চূড়ান্ত বিনিয়োগ কাঠামো কেমন হবে—তা পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

0 Comments