হাতে বৈধ ভিসা, টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার অভিযোগ করছেন কিছু যাত্রী। অভিযোগ রয়েছে, নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে তাদের এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘোরানো হয়। পরে ‘সমস্যা সমাধানের’ নামে অর্থ দাবি করা হয়।
যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস ও গ্রাউন্ড সার্ভিসের কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যাগেজ, বোর্ডিং পাস এবং আসন আপগ্রেড ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অতিরিক্ত ব্যাগেজে ৫২ হাজার টাকার অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে আসা একটি ঘটনায়, ১৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের এক যাত্রীর সঙ্গে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ নেওয়ার জন্য ৫২ হাজার টাকার লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যাগ দুটি যাত্রীর নিজের নামে ট্যাগ না করে অন্য একটি যাত্রীগ্রুপের ব্যাগেজ সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরে সিস্টেমে ট্যাগ পরিবর্তন ও সংশোধনের ঘটনাও ঘটে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সংশ্লিষ্ট যাত্রী রসিদ ও নিজের নামে ব্যাগেজ ক্লেইম ট্যাগ দাবি করেন। পরবর্তী সময়ে অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা এবং পরে পেমেন্ট স্লিপ দেওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বৈধ কাগজপত্র, তবুও বোর্ডিং পাসের জন্য অর্থ দাবির অভিযোগ
আরেক ঘটনায় আবুধাবি হয়ে পর্তুগালগামী ৯ যাত্রীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাত্রীদের কাগজপত্র যাচাই করে চেকইনের অনুমতি দেওয়া হলেও তাদের চেকইন না করে অপেক্ষায় রাখা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি অর্থ দিতে রাজি হলে তাদের বোর্ডিং পাস দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সিঙ্গাপুর ফ্লাইটেও ব্যাগেজ ফি নিয়ে অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও একটি ঘটনায় সিঙ্গাপুরগামী এক যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি হিসেবে ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে ওই যাত্রী বোর্ডিং গেটে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট অর্থ জমা দেখানোর জন্য তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাস আপগ্রেড?
শুধু ব্যাগেজ বা বোর্ডিং পাস নয়, ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীকে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড করার অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে টরন্টোগামী ফ্লাইট এবং হজ ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের সময় কিছু কর্মকর্তা হজ এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ করতেন—এমন অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারা জড়িত—যা বলছে অনুসন্ধান
যুগান্তরের প্রতিবেদনে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের একজন কাউন্টার সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি চক্রের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রাউন্ড সার্ভিসের কয়েকজন কর্মীর নামও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হয়নি। বিষয়টি তদন্ত ও যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: নজরদারি বাড়াতে হবে
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনোভাবেই অর্থ আদায়ের মাধ্যম হওয়া উচিত নয়।
তার মতে, অভিযোগগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সিস্টেম লগ, ব্যাগেজ ট্যাগ, পেমেন্ট রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
‘অভিযোগের সত্যতা পেলে ছাড় নয়’
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান লিটন জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। যাত্রী হয়রানি রোধে জিরো টলারেন্স নীতির কথাও জানান তিনি।
যাত্রীসেবায় প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা
বিমানবন্দর একটি দেশের আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। সেখানে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো যাত্রীকে হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানে বাধ্য করার অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়—এটি প্রতিষ্ঠানের সেবা, রাজস্ব এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এখন মূল প্রশ্ন—অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগগুলোর কতটা সত্য এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত। সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই তার উত্তর মিলতে পারে।
এক নজরে
| বিষয় | অভিযোগ/তথ্য |
|---|---|
| স্থান | হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর |
| সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান | বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স |
| অভিযোগের ধরন | যাত্রী হয়রানি ও অর্থ আদায় |
| ব্যাগেজ | অতিরিক্ত ব্যাগের জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগ |
| বোর্ডিং পাস | জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ |
| সিঙ্গাপুর ফ্লাইট | ৫ হাজার টাকা ব্যাগেজ ফি নিয়ে অভিযোগ |
| আপগ্রেড | অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাস দেওয়ার অভিযোগ |
| বর্তমান অবস্থা | বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে |

0 Comments