Header Ads Widget

Responsive Advertisement

দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় ৯৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি! প্রশ্ন উঠছে খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে


ঢাকা: ঢাকার আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। অথচ ২০১৯ সালে প্রকল্প দুটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রস্তাবিত ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

মেট্রোরেল ঢাকার যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এ নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ নেই। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ব্যয় এতটা বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল অর্থের কতটা প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় এবং কতটা পরিকল্পনা, দরপত্র, নকশা, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার ফল?

৯৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি

ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চিত্র পাওয়া যাচ্ছে দুটি প্রকল্পে।

এমআরটি লাইন-১:
২০১৯ সালে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা

এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর):
প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা

দুটি প্রকল্পের মোট সংশোধিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা

প্রতি কিলোমিটারে হাজার হাজার কোটি টাকা!

ব্যয়ের হিসাব আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এমআরটি লাইন-১-এর দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন হলে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা

অন্যদিকে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় দাঁড়ানোর কথা প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা

এই হিসাবই সাধারণ মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তুলে ধরছে—ঢাকার মেট্রোরেল নির্মাণে কেন প্রতি কিলোমিটারে এত বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে?

নকশা, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম—কতটা দায়ী?

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যায় ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন

  • নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি

  • মূল্যস্ফীতি

  • টাকার অবমূল্যায়ন

  • যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি

  • ভ্যাট ও কর

  • ভূমি অধিগ্রহণ

  • সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর

  • পরামর্শক ব্যয়

  • নির্মাণকালীন সুদ

  • বিভিন্ন আপৎকালীন ব্যয়

২০১৯ সালে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হলেও ২০২৫ সালের হিসাবে তা প্রায় ১২২ টাকা ধরা হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের টাকায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন দিয়ে এত বড় ব্যয় বৃদ্ধির পুরোটা ব্যাখ্যা করা যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: দরপত্রে প্রতিযোগিতা কোথায়?

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—দরপত্রে প্রতিযোগিতার ঘাটতি

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাইকার বিভিন্ন শর্তের কারণে দরপত্রে মূলত জাপানি কোম্পানিগুলো অংশগ্রহণ করে এবং প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তিগত শর্তও রাখা হয়, যা অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কঠিন করে তোলে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি প্রকল্পে প্রকৃত বাজারদর যাচাই এবং দর-কষাকষির সুযোগ কমে যেতে পারে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকও বলেছেন, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে ব্যয় কমানো কঠিন। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন ও নকশা পরিবর্তনের কারণে যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে, কিন্তু তা ‘আকাশচুম্বী’ হওয়ার সুযোগ নেই।

তাহলে কি দুর্নীতির আশঙ্কা আছে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ব্যয় বেড়েছে বলেই দুর্নীতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এই প্রতিবেদনে নেই।

তবে একটি প্রকল্পের ব্যয় যদি প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায় এবং একই সঙ্গে দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে, তাহলে স্বচ্ছতা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।

এ কারণে সংশোধিত ব্যয়ের প্রতিটি খাত স্বাধীনভাবে যাচাই করা, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

‘মেট্রোরেল দরকার’—কিন্তু কত খরচে?

সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ঢাকার জন্য মেট্রোরেল প্রয়োজন; তা না হলে ঢাকা বাঁচানো কঠিন হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ নকশা আগে না থাকায় প্রাথমিক ব্যয়ে কিছু বিষয় ধরা সম্ভব হয়নি। এখন বাড়তি ব্যয়ে কাজ না করলে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু মেট্রোরেল হবে কি না—তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, মেট্রোরেল কতটা দক্ষ পরিকল্পনায় এবং কতটা স্বচ্ছ ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে।

জনগণের টাকার হিসাব কি প্রকাশ্যে আসবে?

দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলে এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের হিসাব থাকে না; এটি দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ ঋণপরিশোধের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

তাই সরকারের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—

১. প্রতিটি ব্যয় খাতের বিস্তারিত হিসাব কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে?
২. একই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা করা হয়েছে কি?
৩. দরপত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না?
৪. প্রকল্পের নকশা পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের স্বাধীন যাচাই হয়েছে কি?
৫. ব্যয় কমানোর জন্য বিকল্প নকশা বা প্রযুক্তি মূল্যায়ন করা হয়েছে কি?
৬. ভবিষ্যতে প্রকল্প ব্যয় আবার বাড়বে না—এমন নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে?

মেট্রোরেল চাই, কিন্তু ‘সাদা হাতি’ নয়

ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক গণপরিবহন অপরিহার্য। কিন্তু উন্নয়নের নামে এমন ব্যয় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যার যৌক্তিকতা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।

মেট্রোরেল ঢাকাকে বাঁচাবে—কিন্তু সেই মেট্রোরেল যেন অস্বচ্ছ ব্যয়, সীমিত প্রতিযোগিতা কিংবা দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।

তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত দরপত্র, আন্তর্জাতিক ব্যয়তুলনা এবং প্রতিটি বড় ব্যয়ের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এক নজরে

  • দুটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয়: ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা

  • সংশোধিত প্রস্তাবিত ব্যয়: ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা

  • এমআরটি লাইন-১: প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা

  • এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর): প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা

  • অর্থায়নকারী: জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা

  • প্রধান প্রশ্ন: ব্যয় বৃদ্ধি, দরপত্রের প্রতিযোগিতা ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা

  • বর্তমান অবস্থা: সংশোধিত ব্যয় অনুমোদনের প্রক্রিয়ায়

Post a Comment

0 Comments