আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্দামান সাগরে বিপজ্জনক অবস্থায় ভাসতে থাকা একটি নৌযান থেকে ৮১ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধারের পর তাদের কোথায় রাখা হবে—তা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল কূটনৈতিক আলোচনা। ভারতের বক্তব্য ছিল, নৌযানটি বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করেছিল এবং উদ্ধার হওয়া অনেকের কাছে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের দেওয়া পরিচয়পত্র রয়েছে। তাই তাদের নিরাপদে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিল নয়াদিল্লি।
তবে বাংলাদেশ সেই অবস্থান গ্রহণ করেনি। ঢাকার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সমুদ্রে ভাসমান নৌযানটি বাংলাদেশের জলসীমায় ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট জলসীমার কাছাকাছি দেশগুলোকেই আন্তর্জাতিক আইন ও burden-sharing নীতির আলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।
কীভাবে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিল নৌযানটি?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার এলাকা থেকে প্রায় ৯০ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে একটি নৌযান মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। চার দিন পর নৌযানটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে সেটি আন্দামান সাগরে দিশাহীনভাবে ভাসতে থাকে।
নৌযানটিতে পর্যাপ্ত খাবার ও পানির সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকে থাকার পর কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
৮১ জনকে উদ্ধার করে ভারতীয় কোস্টগার্ড
পরিস্থিতি জানতে পেরে ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী নৌযানটির সন্ধান পায়। পরে ৮১ জন জীবিত রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে তাদের খাবার, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন নৌযানটিতে থাকা আটজন ইতোমধ্যে মারা গিয়েছিলেন।
ভারতের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৪৭ জনের কাছে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের দেওয়া পরিচয়পত্র ছিল। এসব নথিতে তাদের মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কেন বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিল ভারত?
ভারতের যুক্তির মূল বিষয় ছিল—নৌযানটি বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করেছিল এবং যাত্রীদের একটি অংশ বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাই তাদের নিরাপদে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিল ভারত।
তবে বিষয়টি কেবল দুই দেশের মধ্যে একটি নৌযান ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং সমুদ্রে বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার করার আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অবস্থান কী ছিল?
বাংলাদেশ তখন ভারতের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, নৌযানটি বাংলাদেশের জলসীমায় ছিল না এবং ঘটনাস্থল বাংলাদেশের উপকূল থেকে অনেক দূরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নৌযানটির অবস্থান ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার দূরে; পাশাপাশি এটি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের কাছাকাছি অঞ্চলে ছিল।
বাংলাদেশ আরও জানায়, অতীতে বাংলাদেশের জলসীমায় বিপদে পড়া রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করেছে। তাই সংশ্লিষ্ট জলসীমা ও আশপাশের রাষ্ট্রগুলোকেও আন্তর্জাতিক আইন ও burden-sharing নীতি অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি মীনাক্ষী গাঙ্গুলি যুক্তি দেন, ভারতীয় কোস্টগার্ড যখন বিপদগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার করেছে, তখন তাদের সুরক্ষা ও আশ্রয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউএনএইচসিআরের সরাসরি প্রবেশাধিকার দিয়ে প্রত্যেকের পরিস্থিতি যাচাই করার কথাও বলা হয়।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী আলি জোহর বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মিয়ানমারে নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে—এমন মতও তিনি তুলে ধরেন।
সমুদ্রে কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা?
রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতার পেছনে নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিভিন্ন কারণ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছে।
২০২১ সালের ওই ঘটনায়ও নৌযানটি বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হয়েছিল। ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
ঘটনা: আন্দামান সাগরে রোহিঙ্গাবাহী নৌযান উদ্ধার
যাত্রার স্থান: কক্সবাজার এলাকা
যাত্রার তারিখ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১
উদ্দেশ্য: মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা
উদ্ধার: ৮১ জন জীবিত
মৃত্যু: ৮ জনের মৃত্যুর তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত
মূল সংকট: নৌযানের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সমুদ্রে ভেসে থাকা
ভারতের অবস্থান: বাংলাদেশে নিরাপদে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা
বাংলাদেশের অবস্থান: ঘটনাস্থল বাংলাদেশের জলসীমায় নয়; সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব নেওয়া উচিত
ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই ঘটনা রোহিঙ্গা সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে—শরণার্থীরা যখন স্থলসীমা পেরিয়ে সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং বিপদে পড়েন, তখন তাদের উদ্ধার, আশ্রয় ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব কার?
আন্দামান সাগরের এই ঘটনা ভারত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছিল। পাশাপাশি এটি দেখিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়েছে।

0 Comments