Header Ads Widget

Responsive Advertisement

অবৈধ অস্ত্রের দাপটে বাড়ছে সহিংসতা, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন


তিন মাসে ৯১৫টি হত্যা মামলা; বিশেষ অভিযানে উদ্ধার ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র সংঘাতকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১ মে থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযান চলাকালে এখন পর্যন্ত ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৫২টি ম্যাগাজিন, ৩২টি হাতবোমা এবং প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি গানপাউডার উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

তিন মাসে ৯১৫ হত্যা মামলা

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যা মামলা হয়েছিল ৭৯৪টি। আগের বছরের একই তিন মাসে ৯৯৩টি মামলা হলেও এর মধ্যে ২২৬টি ছিল পূর্ববর্তী ঘটনার জের। ফলে চলতি বছরের পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ঢাকা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড

মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি হত্যা মামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে।

মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকায় ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

চট্টগ্রামে রাজনৈতিক বিরোধ ও অস্ত্রের ব্যবহার

চট্টগ্রামের রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

এখনো উদ্ধার হয়নি শত শত লুট হওয়া অস্ত্র

২০২৪ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ৯৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ৭০০টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৬১৭টি অস্ত্র জমা পড়েছিল।

তবে হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৬৫টি লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সীমান্তপথে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশের আশঙ্কা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যানে সীমান্তবর্তী এলাকাতেও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগেই বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্ত দিয়ে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র সহজে প্রবেশ ও গোপন করা সম্ভব হওয়ায় অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ১১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত হয়েছেন।

এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত এবং মে মাসে ৬৪টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীতেও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার

শুধু সীমান্ত বা মফস্বল নয়, রাজধানীতেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুর এলাকায় বিদেশি অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ

হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়—লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নয়নে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Post a Comment

0 Comments