জাতীয় ডেস্ক
জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে প্রসিকিউশন এবং এরই মধ্যে সে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
যে তিন অভিযোগে দায় প্রমাণিত
মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আনা মোট আটটি অভিযোগের মধ্যে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের ঘটনায় তার দায় প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা এবং সহযোগিতার অভিযোগেও ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।
প্রতিটি প্রমাণিত অভিযোগে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ ১০ বছর। একই সঙ্গে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ অভিযোগে খালাস
অন্যদিকে ইনুর বিরুদ্ধে আনা ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে ট্রাইব্যুনাল তাকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন।
অর্থাৎ, মামলার আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দায় প্রমাণিত হলেও বাকি পাঁচটিতে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগের প্রমাণ পাননি।
কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের বিষয়ে যে অভিযোগ
মামলার একটি অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছবি দেখে তাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাদের আটক ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে ইনু নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন অভিযোগ আনা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪ দলীয় জোটের বৈঠক ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ অভিযোগ
মামলার আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করা হয় এবং ইনু ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা ও সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ ছিল।
তবে এই অভিযোগটি প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল ইনুকে খালাস দিয়েছেন।
মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার হামলার অভিযোগও প্রমাণিত নয়
আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি ছত্রীসেনা মোতায়েন এবং হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার পরিকল্পনায় ইনুর সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছিল।
এ ছাড়া বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে সমর্থনের অভিযোগও ছিল। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিযোগগুলোও প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের অভিযোগ
ইনুর বিরুদ্ধে আনা সপ্তম অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের অভিযোগ
মামলার অষ্টম অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারী ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নিহত হওয়ার ঘটনায় নির্দেশনার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
একই অভিযোগে দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও ছিল। তবে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ইনুকে এ অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
সামনে কী?
ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর প্রসিকিউশন পক্ষ জানিয়েছে, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। ফলে মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আপিলের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে হাসানুল হক ইনু শাপলা চত্বরের ২০১৩ সালের ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি মামলাতেও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক নজরে
আসামি: হাসানুল হক ইনু
পদ: জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী
ট্রাইব্যুনাল: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২
মোট অভিযোগ: ৮টি
প্রমাণিত: ৩টি
খালাস: ৫টি
কারাদণ্ড: মোট ১০ বছর
পূর্ণাঙ্গ রায়: প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা
পরবর্তী পদক্ষেপ: প্রসিকিউশনের আপিলের প্রস্তুতি

0 Comments