আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন ও চীনা নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার USS Decatur-এর খুব কাছাকাছি চলে আসে একটি চীনা Luyang-class ডেস্ট্রয়ার। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই জাহাজের ন্যূনতম দূরত্ব ছিল প্রায় ৪৫ গজ বা ৪১ মিটার। সংঘর্ষ এড়াতে USS Decatur-কে গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়।
ঘটনাটি দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের Gaven Reef ও Johnson Reef-এর আশপাশে ঘটে। অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক দেশের territorial claim-এর কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল সংঘর্ষের পরিস্থিতি?
মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, USS Decatur ওই এলাকায় একটি Freedom of Navigation Operation (FONOP) পরিচালনা করছিল। এ ধরনের অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিতর্কিত সামুদ্রিক এলাকায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, একটি চীনা Luyang-class ডেস্ট্রয়ার USS Decatur-এর দিকে এগিয়ে আসে এবং একাধিকবার গতিপথ পরিবর্তন করে। একপর্যায়ে চীনা জাহাজটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজটির সামনের অংশের প্রায় ৪৫ গজের মধ্যে চলে আসে। এরপর সংঘর্ষ এড়াতে USS Decatur গতিপথ পরিবর্তন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ কী ছিল?
মার্কিন নৌবাহিনী ঘটনাটিকে “unsafe and unprofessional” বা অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ হিসেবে বর্ণনা করে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, চীনা জাহাজটি USS Decatur-কে ওই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করছিল এবং ক্রমশ কাছাকাছি এসে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে সংঘর্ষের ঝুঁকি দেখা দেয়।
চীনের বক্তব্য ছিল ভিন্ন
চীন ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, USS Decatur চীনের দাবি করা জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। এ কারণে চীনা নৌবাহিনী একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে মার্কিন জাহাজটিকে সতর্ক করে এবং এলাকা থেকে সরে যেতে বলে।
অর্থাৎ, ঘটনাটির কারণ ও দায় নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য ছিল পরস্পরবিরোধী।
কেন দক্ষিণ চীন সাগর এত গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। এর মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। পাশাপাশি অঞ্চলটির বিভিন্ন দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক এলাকার মালিকানা নিয়ে চীনসহ কয়েকটি দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর বিভিন্ন অংশ নিয়ে চীন, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও তাইওয়ানের overlapping claims রয়েছে।
মাত্র ৪১ মিটার দূরত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুদ্ধজাহাজের ক্ষেত্রে কয়েক দশক মিটার দূরত্ব অত্যন্ত কম। উচ্চগতিতে চলা বড় নৌযানের ক্ষেত্রে এমন কাছাকাছি অবস্থান সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগের সমস্যাকেও দুর্ঘটনায় পরিণত করতে পারে।
২০১৮ সালের এই ঘটনার পর প্রকাশিত ছবিতেও দুই যুদ্ধজাহাজকে অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যায়। পরবর্তী প্রতিবেদনে মার্কিন নৌবাহিনীর ছবির ভিত্তিতে ন্যূনতম দূরত্ব প্রায় ৪১ মিটার বলে উল্লেখ করা হয়।
সংঘর্ষ হলে কী হতে পারত?
দুই দেশের সামরিক জাহাজ সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে সেটি শুধু একটি সামুদ্রিক দুর্ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তখন বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও দক্ষিণ চীন সাগরের সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে উত্তেজনা চলছিল।
তাই এমন একটি সামরিক মুখোমুখি অবস্থান ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনার মাধ্যমে বৃহত্তর কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ছিল।
এক নজরে
ঘটনা: চীনা ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রায় সংঘর্ষ
তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্থান: দক্ষিণ চীন সাগর, Gaven Reef-এর কাছে
মার্কিন জাহাজ: USS Decatur
চীনা জাহাজ: Luyang-class destroyer
সর্বনিম্ন দূরত্ব: প্রায় ৪৫ গজ/৪১ মিটার
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য: অনিরাপদ ও অপেশাদার manoeuvre
চীনের বক্তব্য: মার্কিন জাহাজ চীনের দাবি করা জলসীমায় প্রবেশ করেছিল
ফলাফল: সংঘর্ষ হয়নি; USS Decatur গতিপথ পরিবর্তন করে
কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ?
২০১৮ সালের এই ঘটনা দেখিয়েছিল, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক জাহাজের মুখোমুখি অবস্থান কত দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচল, আঞ্চলিক territorial claims এবং দুই পরাশক্তির সামরিক উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে অঞ্চলটি এখনো বৈশ্বিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

0 Comments