পুলিশবাহিনীকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আওতায় জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন ও সরঞ্জাম কেনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার, বডি ক্যামেরা চালু এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাইসহ একাধিক উদ্যোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ১৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পুলিশের সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের পাশাপাশি র্যাবের নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ
সংসদীয় কমিটির আলোচনায় উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো এখন অন্যতম অগ্রাধিকার। অনেক থানায় প্রয়োজনীয় যানবাহনের সংকট রয়েছে। পুরোনো ও অপ্রতুল গাড়ির কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
এই সংকট মোকাবিলায় ২ হাজার ৫৮৯টি গাড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নিয়োগ পাবে আরও ১০ হাজার কনস্টেবল
পুলিশের জনবল সংকট কমাতে চলতি বছর আরও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকে জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থগিত থাকা ২ হাজার এসআই পদে মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সংসদীয় কমিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
পুলিশের হাতে আসছে বডি ক্যামেরা
পুলিশ সংস্কারের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে বডি ক্যামেরার ব্যবহার।
দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা থাকলে অভিযান ও অন্যান্য কার্যক্রমের ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পুলিশের কার্যক্রমের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ সহজ হবে।
সংসদীয় কমিটির মতে, বডি ক্যামেরা পুলিশের জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে আরও সতর্কতা তৈরি করতে পারে।
পুলিশে বাড়ছে AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও বিচারব্যবস্থাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিজিটাল কোডিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ শনাক্তকরণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম আরও দক্ষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই
সংস্কার পরিকল্পনায় শুধু অবকাঠামো বা প্রযুক্তি নয়, জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
অভিযোগের গুরুত্ব, সংশ্লিষ্টতার ধরন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট
২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য—
পরিচালন বাজেট: ২৮ হাজার ৬৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা
উন্নয়ন বাজেট: ২ হাজার ৪৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা
মোট: প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা
এই অর্থের আওতায় জনবল, যানবাহন, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এত বড় অর্থের ব্যয়ে নিয়োগ ও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি। গাড়ি ও সরঞ্জাম কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাও বৈঠকে উঠে এসেছে।
র্যাবের নাম ও কাঠামোতেও পরিবর্তনের আভাস
পুলিশ সংস্কারের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়েও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধু নাম পরিবর্তন নয়—র্যাবের কাঠামো, দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে নতুন নাম কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, র্যাব বিলুপ্ত না করে নাম পরিবর্তন এবং নতুন কাঠামোগত আইনের মাধ্যমে বাহিনীকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’
বৈঠকে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চাঁদাবাজি বন্ধে আইনি দুর্বলতা দূর করা, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ ও জুয়া মোকাবিলায় পুরোনো আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মাদকসংক্রান্ত মামলার এজাহার আরও নির্ভুল ও সুনির্দিষ্টভাবে তৈরির সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
জনগণের আস্থা ফেরানোই বড় পরীক্ষা
সংসদীয় কমিটির মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের পর পুলিশের ভাবমূর্তিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একদিকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও জবাবদিহি, অন্যদিকে প্রযুক্তি, জনবল ও সরঞ্জামের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো—দুই দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এক নজরে পুলিশের সংস্কার পরিকল্পনা
মোট বাজেট: প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা
নতুন কনস্টেবল: ১০ হাজার
পরিকল্পিত নতুন গাড়ি: ২,৫৮৯টি
এসআই পদ: স্থগিত ২ হাজার পদের পরীক্ষা সম্পন্ন
প্রযুক্তি: AI ও ডিজিটাল কোডিং
জবাবদিহি: বডি ক্যামেরা
র্যাব: নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব পর্যালোচনা
মাদক: জিরো টলারেন্স
সাইবার অপরাধ: আইন সংস্কারের উদ্যোগ
প্রধান লক্ষ্য: সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব ও জনগণের আস্থা বৃদ্ধি

0 Comments