বিনোদন ও সংস্কৃতি ডেস্ক:
সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐক্য ধরে রাখার আহ্বানে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’-এর জাতীয় কনভেনশন।
‘কণ্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন নিত্য-কালের ডাক’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুক্রবার দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লেখক, শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ছিল শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শোভাযাত্রা দিয়ে শুরু, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক আয়োজন
শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে সকালে কনভেনশনের উদ্বোধন করেন সাংবাদিক ও লেখক নূরল কবীর।
উদ্বোধনের পর লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। পরে দিনব্যাপী দুটি অধিবেশনে আলোচনা সভা চলে। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
‘ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রগতিশীল সংস্কৃতি প্রয়োজন’
কনভেনশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে নূরল কবীর বলেন, কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্থায়ী ও অর্থবহ করতে হলে তার ভিত্তিতে প্রগতিশীল, জনস্বার্থমুখী ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উপস্থিতি প্রয়োজন।
বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন বড় পরিবর্তন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে লেখক, শিল্পী, কবি, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো আন্দোলন যখন সমাজের গভীরে পৌঁছে যায়, তখন মানুষের রাজনৈতিক ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষা মিছিল, স্লোগান, দেয়াললিখন এবং গানের মতো সাংস্কৃতিক প্রকাশের মধ্যেও ফুটে ওঠে।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও সমালোচনা
আলোচনা পর্বে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
তিনি সংস্কৃতিকে মানুষের চিন্তা, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়।
‘গানই আমার অস্ত্র’
কনভেনশনে বক্তব্য দেন বাউল শিল্পী আবুল সরকার। নিজের শিল্পচর্চার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গানই তার মনের কথা প্রকাশের মাধ্যম এবং সেটিই তার স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন।
তার বক্তব্যে সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চাকে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ইতিহাসে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা
১৯৫৭ সালের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনের প্রসঙ্গও উঠে আসে আলোচনায়।
৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেত্রী দীপা দত্ত বলেন, ওই সাংস্কৃতিক উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের শিল্পী ও সাহিত্যিকদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। ইতিহাসের এসব অভিজ্ঞতা বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কারা ছিলেন আয়োজনে?
কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কবি মোহন রায়হানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লেখক, শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
সংস্কৃতিকে সামনে রেখে ঐক্যের বার্তা
দিনব্যাপী এই আয়োজনের মূল বার্তায় উঠে এসেছে—সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা প্রয়োজন।
আলোচনা, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা দেশের সাংস্কৃতিক ঐক্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

0 Comments