আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর প্রযুক্তি ও ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাতে যুগান্তর জানিয়েছে, ভুল গোয়েন্দা তথ্য, পুরোনো স্যাটেলাইট ছবি এবং এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ওই হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১২৩ শিশু নিহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের অভিযোগ উঠল?
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার দিন স্কুলটিতে দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পেন্টাগনের কিছু কর্মকর্তা জানতে পারেন যে ওই হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীই চালিয়েছে। তদন্তে লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সময়ের চাপ, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং পুরোনো স্যাটেলাইট ছবির বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ছিল ব্যাপক হামলা
তদন্তে উঠে এসেছে, সংঘাত শুরুর সময় মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক আকারে বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে লক্ষ্যবস্তু যাচাই ও চূড়ান্ত করার জন্য তুলনামূলকভাবে কম সময় ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। একই সময়ে বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষায় নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং হামলার স্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকাও ভুল লক্ষ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আগে সামরিক স্থাপনা, পরে স্কুল
তদন্তে বলা হয়েছে, যে স্থানে স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছিল সেটি আগে একটি সামরিক স্থাপনার অংশ ছিল। পরবর্তীতে দেয়াল দিয়ে জায়গাটি আলাদা করে সেখানে প্রকাশ্যভাবে স্কুল পরিচালনা করা হচ্ছিল।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও স্থাপনার বর্তমান ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য লক্ষ্য নির্ধারণের সময় বিবেচনায় এসেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এআই সিস্টেমের ওপর কতটা নির্ভরতা ছিল?
তদন্তে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কিছু কর্মকর্তার Palantir-এর ‘Maven Smart System’ ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল—সিস্টেমটি পুরোনো বা পরস্পরবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। কিন্তু ওই তথ্যের ভিত্তি ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান কী বলছে?
Palantir জানিয়েছে, ব্যবহৃত মূল গোয়েন্দা তথ্যের জন্য তারা দায়ী নয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি শনাক্ত করা তাদের সফটওয়্যারের দায়িত্ব নয়।
এ ছাড়া ওই হামলার জন্য তাদের সফটওয়্যার সরাসরি দায়ী—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ঘটনাটিকে শুধু ‘এআইয়ের ভুল’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করার আগে গোয়েন্দা তথ্য, মানবিক সিদ্ধান্ত এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও গুরুতর অভিযোগ
এদিকে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন জানিয়েছে, ইরানে ফেব্রুয়ারির দুটি মার্কিন বিমান হামলায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমনটা বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি তারা পেয়েছে।
জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিণতি ঘটানো হামলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনা সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই, স্যাটেলাইট তথ্য ও মানব গোয়েন্দা বিশ্লেষণের সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এআই-নির্ভর বিশ্লেষণকে কীভাবে যাচাই করা হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের দায়িত্ব কতটা থাকবে—এ বিষয়গুলো ভবিষ্যতের সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এক নজরে
স্থান: মিনাব, ইরান
লক্ষ্যস্থল: শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়
নিহত: ১২৩ শিশু—প্রতিবেদন অনুযায়ী
অস্ত্র: দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র
তদন্তে উঠে এসেছে: ভুল গোয়েন্দা তথ্য ও পুরোনো স্যাটেলাইট ছবি
প্রযুক্তি: Palantir-এর Maven Smart System ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তে এসেছে
জাতিসংঘের অনুসন্ধান: যুদ্ধাপরাধের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

0 Comments