অনলাইন ডেস্ক
সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত প্রাইজবন্ড একসময় ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয় ও উপহার দেওয়ার জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। বর্তমানে প্রাইজবন্ডে বিনিয়োগের প্রতি সাধারণ সঞ্চয়কারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাইজবন্ড বিক্রি কমেছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব, মূল্যস্ফীতি এবং বাজারে তুলনামূলক আকর্ষণীয় বিভিন্ন সঞ্চয়ী পণ্য থাকায় প্রাইজবন্ডের জনপ্রিয়তা কমছে।
এক বছরে বিক্রি কমেছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড বিক্রি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে বিক্রি নেমে আসে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকায়।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এতে বোঝা যায়, প্রাইজবন্ড থেকে সরকারের জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে।
নিট বিক্রিতেও বড় পতন
প্রাইজবন্ডের মূল অর্থ ফেরত দেওয়া এবং লটারির পুরস্কার পরিশোধের হিসাবেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল অর্থ বাবদ ৬৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং লটারির পুরস্কার বাবদ ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। সব মিলিয়ে পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল অর্থ পরিশোধ করা হয় ৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং লটারির পুরস্কার বাবদ ২৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। মোট পরিশোধ দাঁড়ায় ৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
এই সময়ে নিট বিক্রি কমে হয়েছে ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
লটারির পুরস্কারও কমেছে
প্রতিবেদনের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে প্রাইজবন্ডের মূল অর্থ পরিশোধ কমেছে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা বা ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
একই সময়ে লটারির ড্র বাবদ পরিশোধ কমেছে ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৪০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
নিট বিক্রির পরিমাণও কমেছে ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ৩৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
কীভাবে কাজ করে প্রাইজবন্ড?
বর্তমানে বাংলাদেশে ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড চালু রয়েছে। নগদ অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ডাকঘর ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নির্ধারিত শাখা থেকে এটি কেনা যায়।
প্রাইজবন্ডে নির্দিষ্ট সুদ বা মুনাফা দেওয়া হয় না। তবে প্রতি তিন মাস পরপর অর্থাৎ বছরে চারবার লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে প্রাইজবন্ডের ৪৬টি সিরিজ রয়েছে। প্রতিটি সিরিজের জন্য রয়েছে নির্ধারিত পুরস্কার।
এক ড্রতে পুরস্কারের কাঠামো
প্রথম পুরস্কার: ৬ লাখ টাকা — ১টি
দ্বিতীয় পুরস্কার: ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা — ১টি
তৃতীয় পুরস্কার: ১ লাখ টাকা — ২টি
চতুর্থ পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা — ২টি
পঞ্চম পুরস্কার: ১০ হাজার টাকা — ৪০টি
প্রতি সিরিজে মোট পুরস্কার: ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা
ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে পুরস্কার দাবি করতে হয়। পুরস্কারের অর্থ পরিশোধের আগে ২০ শতাংশ হারে আয়কর কেটে রাখা হয়।
১৯৭৪ সালে শুরু, সময়ের সঙ্গে বদলেছে জনপ্রিয়তা
জনগণের জন্য সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প বা সঞ্চয়ী উপকরণ হিসেবে ১৯৭৪ সালে প্রাইজবন্ড চালু করা হয়।
একসময় বিয়ে, জন্মদিন কিংবা বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবেও প্রাইজবন্ড দেওয়ার প্রচলন ছিল। সহজে কেনা যায় এবং যার কাছে থাকে, তিনিই এর মালিক—এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি বেশ জনপ্রিয় ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, মানুষের সঞ্চয়ের ধরন পরিবর্তন এবং নতুন নতুন আর্থিক পণ্যের বিস্তারে প্রাইজবন্ডের সেই জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমেছে।
কেন আগ্রহ কমছে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগে প্রাইজবন্ড সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার করা হলেও বর্তমানে সেই প্রচার অনেকটাই কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই প্রাইজবন্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
এ ছাড়া ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় আগের মতো আকর্ষণীয় নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়ী পণ্য রয়েছে এবং সেগুলোর প্রচারও তুলনামূলক বেশি। ফলে সঞ্চয়কারীদের একটি অংশ বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
১ হাজার টাকার প্রাইজবন্ডের প্রস্তাব
প্রাইজবন্ডকে আবারও সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করতে এর মূল্যমান বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ ১ হাজার টাকা বা ৫০০ টাকা মূল্যমানের নতুন প্রাইজবন্ড চালুর কথা বলেছেন। একই সঙ্গে পুরস্কার বা মুনাফা কাঠামো আরও আকর্ষণীয় করা এবং পুরস্কারের ওপর কর কমানো বা তুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাবও রয়েছে।
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বর্তমান মূল্যমান | ১০০ টাকা |
| ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি | ৯৯.৩০ কোটি টাকা |
| ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিক্রি | ৭৭.৯০ কোটি টাকা |
| বিক্রি কমেছে | ২১.৪০ কোটি টাকা |
| বিক্রি কমার হার | ২১.৫৫% |
| সিরিজ | ৪৬টি |
| বছরে ড্র | ৪ বার |
| প্রতি ড্রতে মোট পুরস্কার | ১৬.২৫ লাখ টাকা |
| পুরস্কারের ওপর কর | ২০% |

0 Comments