ডেস্ক রিপোর্ট
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্ষা ও বৃষ্টিপাতের মধ্যে এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়ার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে ৭৫ হাজার ৭৩০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতির আরও উদ্বেগজনক দিক হলো সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর গতি বেড়েছে। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ২ হাজার ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আরও ৮ জন।
ঢাকার পাশাপাশি বাড়ছে অন্যান্য অঞ্চলের চাপ
ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও দেশের প্রায় সব বিভাগে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে—
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন: ২০৬ জন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: ১৬৯ জন
ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকা: ৪৩২ জন
চট্টগ্রাম বিভাগ: ৩২৩ জন
বরিশাল বিভাগ: ২৫৪ জন
খুলনা বিভাগ: ২৬৭ জন
রাজশাহী বিভাগ: ১৯৭ জন
ময়মনসিংহ বিভাগ: ১১৫ জন
রংপুর বিভাগ: ৬২ জন
সিলেট বিভাগ: ১১ জন
অর্থাৎ, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ স্পষ্ট।
সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর চাপ
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বর মাস বিশেষভাবে উদ্বেগের হয়ে উঠেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই মাসে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের অন্য মাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আগস্টে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের এবং জুলাইয়ে ৩৬ জনের।
একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে হাসপাতাল ও ডেঙ্গু ইউনিটগুলোর ওপর চিকিৎসাসেবার চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামেও সংক্রমণের চাপ
রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামেও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম নয় দিনেই চট্টগ্রামে ৫৮৫টি ডেঙ্গু রোগীর ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল। চলতি বছরে ওই জেলায় সেপ্টেম্বরের আগেই ২ হাজারের বেশি রোগী এবং কয়েকটি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
বৃষ্টির কারণে নতুন নতুন পানি জমার স্থান তৈরি হওয়াকে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
লার্ভা নিধনের পাশাপাশি শুরু হচ্ছে নতুন জরিপ
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধন নয়, কোথায় এডিস মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে সেটি শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ দিনের এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে নির্ধারিত সংখ্যক বাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি?
এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার বা স্বচ্ছ জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে। বাসাবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে জমে থাকায় মশার প্রজননস্থল দ্রুত তৈরি হতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের অভিযান নয়, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর উপসর্গে অবহেলা নয়
ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—
জ্বর
মাথাব্যথা
চোখের পেছনে ব্যথা
শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
দুর্বলতা
বমি বা বমি ভাব
জ্বরের সঙ্গে রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
বিশ্লেষণ
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে রোগটি এখন শুধু ঢাকার নগরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানেই ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি।
একটি এলাকায় লার্ভা নিধন করলেই স্থায়ী সমাধান হয় না। নতুন করে পানি জমলে সেখানে আবার এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফলে নিয়মিত জরিপ, তথ্যভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভাব্য ইতিবাচক দিক
নিয়মিত লার্ভা জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
জমে থাকা পানি অপসারণ ও প্রজননস্থল ধ্বংস হলে এডিস মশার বিস্তার কমানো সম্ভব হতে পারে।
জনসচেতনতা বাড়লে নাগরিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার হতে পারে।
দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ গুরুতর জটিলতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক ও চ্যালেঞ্জ
শুধু মৌসুমি অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
শহর ও গ্রাম উভয় পর্যায়ে অসংখ্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।
রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে চাপ আরও বাড়তে পারে।
নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতার ঘাটতি থাকলে সরকারি মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
বৃষ্টির পর নতুন করে পানি জমলে পূর্বের লার্ভা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পরও ঝুঁকি ফিরে আসতে পারে।
জনসাধারণের করণীয়
প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরীক্ষা করে কোথাও পানি জমে আছে কি না তা দেখতে হবে। ফুলের টব, বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত বোতল, ছাদ, নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য পাত্রে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
পাশাপাশি দিনের বেলায়ও এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকি থাকায় প্রয়োজনীয় মশা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ, শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখা এবং শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের অভিযান নয়—বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু হওয়া প্রতিদিনের সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।

0 Comments