বিশ্বজুড়ে আর্থিক শিক্ষা ও বিনিয়োগের কৌশল নিয়ে আলোচিত লেখক রবার্ট কিয়োসাকি এবার বিপুল ঋণের কারণে আলোচনায়। ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের এই লেখকের রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের সঙ্গে প্রায় ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ জড়িত বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ১.২ বিলিয়ন ডলারকে কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে বোঝা হবে।
নিজেই বললেন, ‘আমি ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণে আছি’
সম্প্রতি ‘গেট রিচ এডুকেশন’ পডকাস্টে কিয়োসাকি নিজেই জানান, তিনি প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণে রয়েছেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, তিনি যে পদ্ধতিতে ঋণ ব্যবহার করেন, অন্যদের সেটি অনুসরণ করা উচিত নয়।
কিয়োসাকির যুক্তি হলো—আয় তৈরি করতে পারে এমন সম্পদ কেনার জন্য ঋণ নেওয়া ধনী বিনিয়োগকারীদের একটি কৌশল।
১.২ বিলিয়ন ডলার কি তার ব্যক্তিগত দায়?
কিয়োসাকির সাবেক স্ত্রী ও ব্যবসায়িক অংশীদার কিম কিয়োসাকি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কিয়োসাকি ও তার অংশীদারদের প্রায় ১,৫০০ অ্যাপার্টমেন্ট ইউনিট রয়েছে। এসব সম্পত্তির বিপরীতে নেওয়া ঋণও ওই ১.২ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের মধ্যে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরো অর্থটি রবার্ট কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ঋণ নয়; এর বড় অংশ ব্যবসায়িক সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্পত্তির মূল্য বাড়লে আরও ঋণ
কিয়োসাকির বিনিয়োগ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—সম্পত্তির মূল্য বাড়ার পর সেই বাড়তি মূল্যের বিপরীতে নতুন করে ঋণ নেওয়া।
এভাবে সম্পত্তি বিক্রি না করেই তিনি বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের ঋণ সাধারণত সম্পদ বিক্রির আয়ের মতো নয় এবং এর আলাদা করগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
আলাদা কোম্পানিতে আলাদা বিনিয়োগ
কিয়োসাকি তার বিভিন্ন বিনিয়োগকে পৃথক Limited Liability Company (LLC)-এর অধীনে রাখেন।
এর ফলে একটি বিনিয়োগে সমস্যা তৈরি হলে অন্য সম্পদের ওপর তার প্রভাব সীমিত রাখার সুযোগ থাকে। তিনি এই কাঠামোকে অনেকটা ‘ফায়ারওয়াল’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বছরে আয় প্রায় ৩০ লাখ ডলার?
Vanity Fair-এর হিসাব অনুযায়ী, কিয়োসাকি বছরে প্রায় ৩০ লাখ ডলার আয় করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাব সঠিক হলে, মোট ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মধ্যে তার ব্যক্তিগত দায় আনুমানিক ৩ থেকে ৬ কোটি ডলার হতে পারে—তবে এটি একটি হিসাবভিত্তিক অনুমান, নিশ্চিত ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ নয়।
ঋণ—ধনীদের কৌশল, নাকি বড় ঝুঁকি?
রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী ডেভিড এ. পেরেজের মতে, সম্পত্তির বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় অস্বাভাবিক নয়। তবে এতে ঋণের কিস্তি, সুদের খরচ এবং নগদ প্রবাহের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে জেপিটিডি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা জন পুল সতর্ক করে বলেছেন, ঋণ ভালো বা খারাপ—দুটিই হতে পারে। তবে এত বড় ঋণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে ঝুঁকি সম্পর্কে অত্যন্ত পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।
বিশেষ করে সম্পত্তির দাম বাড়ার পরিবর্তে কমতে শুরু করলে এই ধরনের উচ্চ-ঋণভিত্তিক বিনিয়োগ বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
যে বই বদলে দিয়েছে কিয়োসাকির পরিচিতি
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘Rich Dad, Poor Dad’ বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান রবার্ট কিয়োসাকি।
বইটিতে অর্থ ও বিনিয়োগ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়—একদিকে তার নিজের বাবাকে ‘Poor Dad’ এবং অন্যদিকে শৈশবের বন্ধুর বাবাকে ‘Rich Dad’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে Vanity Fair-এর বরাতে বলা হয়েছে, বইটির ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
মূল শিক্ষা কী?
কিয়োসাকির বক্তব্যের মূল দর্শন হলো—শুধু দৈনন্দিন খরচের জন্য ঋণ না নিয়ে এমন সম্পদে বিনিয়োগ করা, যা ভবিষ্যতে আয় তৈরি করতে পারে।
তবে তার নিজের বিপুল ঋণের উদাহরণই দেখাচ্ছে, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ যেমন বড় সম্পদ তৈরি করতে পারে, তেমনি বাজারের পরিস্থিতি বিপরীত হলে বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ব্যক্তি | রবার্ট কিয়োসাকি |
| পরিচিতি | ‘Rich Dad, Poor Dad’ লেখক |
| আলোচনার কারণ | প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ |
| ঋণের ধরন | মূলত রিয়েল এস্টেট/ব্যবসায়িক সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট |
| অ্যাপার্টমেন্ট | প্রায় ১,৫০০ ইউনিট |
| আনুমানিক বার্ষিক আয় | প্রায় ৩০ লাখ ডলার |
| ব্যক্তিগত দায়ের অনুমান | প্রায় ৩–৬ কোটি ডলার |
| প্রধান ঝুঁকি | সম্পত্তির মূল্য কমে গেলে ঋণের চাপ |

0 Comments