Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ: স্কুল অবরোধ, ৪৪০ আটক, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ


ডেস্ক রিপোর্ট

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই বড় আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মী সংকট, দীর্ঘ ক্লাস সূচি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে বহু উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করা হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে প্রায় ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। একই দিনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে দেশজুড়ে প্রায় ৪০০টিরও বেশি স্কুলে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্য আহত হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

প্যারিস থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে প্রথমে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনটি রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবাদকারীদের অন্যতম অভিযোগ হলো, অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতি, অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা ক্লাস সূচি। বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন বলছে, পর্যাপ্ত জনবল ও সম্পদ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

এক শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, কোনো কোনো শ্রেণিতে ৩৪ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকছে এবং শিক্ষকরা অতিরিক্ত কাজের চাপে রয়েছেন। তাদের দাবি, আন্দোলনের উদ্দেশ্য অযথা ভাঙচুর নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো সরকারের নজরে আনা।

কোথাও শান্তিপূর্ণ, কোথাও সংঘর্ষ

বিক্ষোভের সব জায়গায় পরিস্থিতি একই রকম ছিল না। অনেক স্থানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে স্কুলের সামনে অবস্থান ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। তবে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

লিলসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ময়লার পাত্রে আগুন দেওয়া, বাসস্টপ ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এর জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জসহ জনতা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পদক্ষেপ ছিল সংযত ও আনুপাতিক। অন্যদিকে শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধিরা পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করেছেন। ফলে আন্দোলনকে ঘিরে বিক্ষোভকারীদের আচরণ এবং পুলিশের ভূমিকা—দুই বিষয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর অবস্থান

ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। তবে বিক্ষোভের সঙ্গে সহিংসতা, ভাঙচুর বা এমন কোনো কর্মকাণ্ড যুক্ত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংস পরিস্থিতি শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও সহিংস রূপ নিলে তা দায়িত্বজ্ঞানহীন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

একই দিনে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সে শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, অগ্নিনির্বাপণকর্মীসহ বিভিন্ন সরকারি খাতের কর্মীদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালিত হয়। তাদের দাবির মধ্যে ছিল বেতন, কর্মপরিবেশ এবং সরকারি খাতে ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মীদের কর্মসূচিতে প্রায় ২ লাখ মানুষ অংশ নেন। অধিকাংশ জায়গায় এই কর্মসূচি বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই শেষ হয়।

বাজেট নিয়ে অসন্তোষও আন্দোলনের পেছনে

শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষও যুক্ত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ব্যয় ও আগামী বছরের বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের আন্দোলন জোরালো হয়েছে। ২০২৭ সালের বাজেট খসড়া প্রকাশের আগে এই বিক্ষোভ ও ধর্মঘট সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু শিক্ষার্থীদের স্কুলভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। শিক্ষাব্যবস্থার জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক অসন্তোষও পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

আন্দোলনের বিস্তার কতটা?

আন্দোলনের বিস্তারের চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। সোমবার প্রায় ১৮০টি স্কুলে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেলেও মঙ্গলবার তা প্রায় ৪০০ বা তার বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্কুলের সংখ্যা গণনার পদ্ধতি ও সময়ভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

এতে বোঝা যায়, কয়েক দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষোভ একটি বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। তবে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকে কি না—তার ওপর।

Post a Comment

0 Comments