নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষাজীবন মানেই শুধু বই, পরীক্ষা আর শ্রেণিকক্ষ নয়—শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ ও খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখার কথা বাধ্যতামূলক করা হলেও ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো খেলার মাঠ নেই।
ফলে মাঠের অভাবে অনেক শিশুর অবসর কাটছে স্মার্টফোন, ট্যাব, টেলিভিশন ও কম্পিউটারের পর্দায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, খেলাধুলার সুযোগ কমে গেলে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মাঠ নেই, তাই মোবাইলেই ‘খেলা’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পরিবারের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে মাঠ সংকটের সরাসরি প্রভাব। খেলতে আগ্রহী শিশুরা আশপাশে খেলার জায়গা না পেয়ে দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইসে কাটাচ্ছে।
কেউ মোবাইল ফোনে গেম খেলছে, কেউ ট্যাব বা স্মার্ট টিভিতে সময় দিচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো শিশুর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় তথ্য জানার ক্ষেত্রেও বই বা বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিবর্তে ডিজিটাল সহকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক
রাজধানীতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বড় অংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান ছোট ভবন, গ্যারেজ কিংবা ছাদে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য মাঠ রাখার সুযোগও সীমিত।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিতেই কোনো খেলার মাঠ নেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামেও সংকট
মাঠের সংকট শুধু স্কুল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। দেশে থাকা ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি এবং ৭২ দশমিক ২৬ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ থেকে বঞ্চিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভাগীয় শহরগুলোতেও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। এসব শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ নেই।
নীতিমালায় বাধ্যতামূলক, বাস্তবে কতটা কার্যকর?
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ সংরক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠান চলাকালীন কার্যক্রম শেষে ও ছুটির দিনে আশপাশের শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য তা উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠ থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ছুটির পর মাঠ তালাবদ্ধ রাখার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীরা কতটা সুবিধা পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মাঠের জায়গায় গড়ে উঠছে রেস্টুরেন্ট-ফাস্টফুডের দোকান
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে খেলার মাঠের পরিবর্তে রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকান গড়ে ওঠাও নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এসব স্থানে আড্ডা ও খাবারে সময় কাটাচ্ছে। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকজাত পণ্যের বিক্রি ও প্রচারের অভিযোগও রয়েছে, যদিও শিক্ষাঙ্গনের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি ও প্রচার নিষিদ্ধ।
ঢাকার উন্মুক্ত মাঠও সংকটে
রাজধানীতে কিছু উন্মুক্ত মাঠ থাকলেও অনেকগুলো দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
লালমাটিয়া নিউ কলোনি ক্রীড়া চক্র মাঠের চারপাশে বাজার, ভ্রাম্যমাণ দোকান ও নির্মাণসামগ্রী জমে থাকার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিভিন্ন মেলা ও গাড়ির হাট বসানোর কারণেও শিশু-কিশোরদের মাঠ ব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
ঢাকায় প্রয়োজন ৬১০ মাঠ, আছে মাত্র ২৩৫টি
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) গবেষণা অনুযায়ী, আধুনিক শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে অন্তত একটি খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিবেচনায় প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি মাঠ। কিন্তু বাস্তবে মাঠ রয়েছে মাত্র ২৩৫টি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রায় ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনপ্রতি খোলা জায়গার পরিমাণ এক বর্গমিটারেরও কম।
দিনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে শিশুরা
আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের পর্দায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায়।
এর সঙ্গে ঘুমের ঘাটতি, ওজন বৃদ্ধি, মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ও উঠে এসেছে।
‘সুস্থ দেহ, সুস্থ মন’—বলছেন শিক্ষাবিদরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম মনে করেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও উন্মুক্ত মাঠ থাকা জরুরি।
তার মতে, শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা শিশুদের সুস্থ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাঠ হারালে হারাবে শৈশবও?
খেলার মাঠ শুধু দৌড়ঝাঁপের জায়গা নয়। সেখানে শিশুরা দলবদ্ধভাবে খেলতে শেখে, নেতৃত্বের গুণ তৈরি করে, প্রতিযোগিতা ও পরাজয়কে সামলাতে শেখে এবং বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ পায়।
তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ সংকটকে শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাপন।
প্রযুক্তি শিশুদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মাঠের বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নগর পরিকল্পনায় খেলার জায়গা নিশ্চিত করা তাই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

0 Comments