প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারে রিচার্জ করলেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি টাকা কেটে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ ও প্রশ্ন নিয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আবার ট্যারিফ পরিবর্তনের পর ২০০ থেকে ২২০ ডিজিটের দীর্ঘ টোকেন, মিটারের ‘ভূতুড়ে বিল’, রাতে বা ছুটির দিনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে।
গ্রাহকদের এসব প্রশ্নের জবাব দিতে বেশ কিছু বিষয় পরিষ্কার করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। সংস্থাটির ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট, দীর্ঘ টোকেন এবং ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহের নিয়ম।
রিচার্জের সময় অতিরিক্ত টাকা কাটার কারণ কী?
ডিপিডিসির তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত লোডের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে একবার ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়। কোনো মাসে গ্রাহক মিটার রিচার্জ না করলে সেই মাসের চার্জ জমা থাকে।
পরবর্তী সময়ে রিচার্জ করলে আগের বকেয়া মাসগুলোর ডিমান্ড চার্জের সঙ্গে চলতি মাসের চার্জও একসঙ্গে কেটে নেওয়া হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ডিপিডিসি জানিয়েছে, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের কোনো এলটি-আবাসিক গ্রাহক টানা তিন মাস রিচার্জ না করলে প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা হারে তিন মাসের ডিমান্ড চার্জ দাঁড়াবে ২৫২ টাকা। একই ধরনের নিয়ম পোস্টপেইড গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া কত?
গ্রাহক নিজ অর্থে প্রিপেইড মিটার কিনে স্থাপন করলে ওই মিটারের জন্য মাসিক ভাড়া দিতে হয় না।
অন্যদিকে ডিপিডিসির সরবরাহ করা মিটারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মিটার ভাড়া কাটা হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী—
সিঙ্গেল-ফেজ মিটার: মাসে ৪০ টাকা
থ্রি-ফেজ মিটার: মাসে ২৫০ টাকা
নতুন সংযোগের সময় গ্রাহক নিজে মিটার কিনলে বা নষ্ট মিটারের পরিবর্তে নিজের অর্থে নতুন মিটার স্থাপন করলে ওই মিটারের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় না।
রিচার্জের টাকায় ৫ শতাংশ ভ্যাট
প্রিপেইড মিটার রিচার্জের সময় মোট রিচার্জের অর্থের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ডিপিডিসি। ফলে রিচার্জের পর মিটারে প্রত্যাশার তুলনায় কম ব্যালেন্স দেখানোর একটি কারণ হতে পারে এই ভ্যাট।
২০০–২২০ ডিজিটের দীর্ঘ টোকেন কেন?
ট্যারিফ বা বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের পর প্রথমবার প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করতে গিয়ে অনেক গ্রাহক ২০০ থেকে ২২০ ডিজিটের দীর্ঘ টোকেন দেখতে পান।
এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে জানিয়েছে ডিপিডিসি।
সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার মিটারে সক্রিয় করার জন্য ট্যারিফ পরিবর্তনের পর প্রথম রিচার্জে এই দীর্ঘ টোকেন তৈরি হয়। এরপরের রিচার্জগুলোতে সাধারণত আবার ২০ ডিজিটের স্বাভাবিক টোকেন পাওয়া যায়।
‘ভূতুড়ে বিল’ কি প্রিপেইড মিটারে সম্ভব?
প্রিপেইড মিটারে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল কেটে নেওয়ার কোনো কারিগরি ব্যবস্থা নেই বলে দাবি করেছে ডিপিডিসি।
সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন—বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যহারের ভিত্তিতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটের মূল্য মিটার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হয়।
তবে কমন নিউট্রালজনিত ত্রুটি বা অন্য কোনো কারিগরি সমস্যার কারণে অস্বাভাবিক বিলিংয়ের ঘটনা ঘটতে পারে বলেও জানিয়েছে ডিপিডিসি।
রাতে বা ছুটির দিনে ব্যালেন্স শেষ হলে কী হবে?
ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেই রাতে বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে—এমন নয়।
ডিপিডিসি জানিয়েছে, গ্রাহকদের সুবিধার জন্য সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত সময়কে ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই সময়ে মিটারের ব্যালেন্স শেষ হলেও সংযোগ তাৎক্ষণিকভাবে বিচ্ছিন্ন না হয়ে মিটার নেগেটিভ ব্যালেন্সে চলতে পারে। পরবর্তী রিচার্জের সময় ওই অর্থ সমন্বয় করা হবে।
জরুরি প্রয়োজনে আছে ‘ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স’
মিটারের এনার্জি ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে গ্রাহক প্রয়োজনে ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স ব্যবহার করতে পারেন।
পরবর্তী রিচার্জের সময় ব্যবহৃত ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের অর্থ সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছে ডিপিডিসি।
সমস্যা হলে কী করবেন?
প্রিপেইড মিটারে অস্বাভাবিক টাকা কেটে নেওয়া, বিলিংয়ে অসঙ্গতি, কারিগরি ত্রুটি বা আকস্মিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে গ্রাহকদের দ্রুত অভিযোগ করতে বলেছে ডিপিডিসি।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাহকসেবা কেন্দ্র, অভিযোগ কেন্দ্র অথবা ডিপিডিসির হটলাইন ১৬১১৬-এ যোগাযোগ করা যাবে।
অভিযোগের সময় গ্রাহক নম্বর ও মিটার নম্বর দিলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।
এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | ডিপিডিসির তথ্য |
|---|---|
| ডিমান্ড চার্জ | অনুমোদিত লোড অনুযায়ী মাসে একবার |
| সিঙ্গেল-ফেজ মিটার ভাড়া | ৪০ টাকা/মাস |
| থ্রি-ফেজ মিটার ভাড়া | ২৫০ টাকা/মাস |
| রিচার্জে ভ্যাট | ৫% |
| ট্যারিফ পরিবর্তনের পর দীর্ঘ টোকেন | ২০০–২২০ ডিজিট |
| পরবর্তী সাধারণ টোকেন | প্রায় ২০ ডিজিট |
| ফ্রেন্ডলি আওয়ার | বিকাল ৪টা–সকাল ১০টা |
| ডিপিডিসি হটলাইন | ১৬১১৬ |
গ্রাহকদের জন্য মূল বার্তা
প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের পর টাকা কমে যাওয়ার অর্থ সবসময় অতিরিক্ত বা ‘ভূতুড়ে বিল’ নয়। ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট এবং আগের বকেয়া সমন্বয়ের কারণে রিচার্জের অর্থ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কেটে যেতে পারে।
তবে অস্বাভাবিক কাটাকাটি বা কারিগরি সমস্যা মনে হলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে মিটার নম্বর ও গ্রাহক তথ্যসহ ডিপিডিসিতে অভিযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

0 Comments