Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত মালয়েশিয়া, কুচিংয়ে বায়ুদূষণ ৪০৭


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও ও সুমাত্রা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মালয়েশিয়া। বিশেষ করে দেশটির সারাওয়াক রাজ্যে বায়ুদূষণ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। ধোঁয়াশায় আকাশ ঢেকে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে হাঁপানি, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ও চোখের প্রদাহের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিস্থিতির কারণে বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন বহিরাঙ্গন অনুষ্ঠান এবং বন্ধ রাখা হয়েছে শত শত স্কুল।

কুচিংয়ে বায়ুদূষণ সূচক ৪০৭, সেরিয়ানে ৪০৮

মঙ্গলবার সারাওয়াকের ছয়টি এলাকায় বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। মালয়েশিয়ার এয়ার পলিউট্যান্ট ইনডেক্সে ১০০-এর বেশি স্কোরকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হলেও রাজ্যের রাজধানী কুচিংয়ে সূচক ৪০৭ এবং কালিমানতান সীমান্তবর্তী সেরিয়ানে ৪০৮ পর্যন্ত উঠে যায়।

ইন্দোনেশিয়ার অংশের বোর্নিও দ্বীপ, যা কালিমানতান নামে পরিচিত, সেখানে জ্বলতে থাকা দাবানলের ধোঁয়া পুরো আগস্টজুড়ে সারাওয়াকের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব মালয়েশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল ছাড়িয়ে ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুরেও পড়েছে।

২০১৫ সালের পর ভয়াবহতম ধোঁয়াশার আশঙ্কা

বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১৫ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ভয়াবহ ধোঁয়াশা পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৫ সালের দাবানলে কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাঁচ লাখের বেশি মানুষ শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগেছিলেন।

বাড়ছে হাঁপানি ও চোখের রোগ

দাবানলের ধোঁয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ থেকে ২৯ আগস্টের সপ্তাহে হাঁপানির রোগী বেড়ে ১ হাজার ৮১১ জনে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২১৯।

একই সময়ে চোখের প্রদাহ বা কনজাংটিভাইটিসের ঘটনাও ১৪৬ থেকে বেড়ে ৭২০টিতে পৌঁছেছে।

কুচিংয়ের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনি নীল আকাশ দেখতে পাননি। তাঁর ১০ মাস বয়সী মেয়ে ফুসফুসের সংক্রমণের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও ধোঁয়ার কারণে কাশি, বমি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে এবং দুইবার জরুরি বিভাগে নিতে হয়েছে।

বন্ধ হচ্ছে স্কুল, বাতিল হচ্ছে অনুষ্ঠান

বায়ুদূষনের কারণে সারাওয়াকে স্বাধীনতা দিবসের কয়েকটি বহিরাঙ্গন অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী, বায়ুর মানের সূচক ১০০ ছাড়ালে স্কুলের বাইরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় এবং ২০০ ছাড়ালে স্কুল বন্ধ করতে হয়। এরই মধ্যে ২০ ও ২১ আগস্ট কুচিং ও আশপাশের প্রায় ৬০০ স্কুল বন্ধ ছিল, যার ফলে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৮ আগস্ট সারাওয়াকে আরও ৩০টি স্কুল বন্ধ করা হয়।

বায়ুর মানের সূচক ৫০০ ছাড়িয়ে গেলে স্থানীয় জরুরি অবস্থা জারি করে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস বন্ধ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সারাওয়াকের উপপ্রধানমন্ত্রী ডগলাস উগাহ এমবাস। সে ক্ষেত্রে শুধু জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে।

ধোঁয়ার মূল উৎস কালিমানতানের দাবানল

মালয়েশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়াশার প্রধান উৎস ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতান অঞ্চলের দাবানল। ইন্দোনেশিয়ার উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী দান্তে সাকসোনো হারবুওনো জানিয়েছেন, জুলাই ও আগস্টে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মানুষ শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়েছেন।

এ ছাড়া বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ সরাসরি দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছেন।

ইন্দোনেশিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বোর্নিও ও সুমাত্রায় দুই লাখ হেক্টরের বেশি জমি আগুনে পুড়েছে। শুধু জুলাই মাসেই পুড়েছে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর।

কেন এত ভয়াবহ দাবানল?

বিশ্লেষকদের মতে, এসব দাবানলের একটি বড় অংশ জমি পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়। পাম তেল, কৃষি ও কাগজশিল্পের জন্য বন এবং কার্বনসমৃদ্ধ পিটল্যান্ড পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক দাবানলের ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি দাবানলের মৌসুম আরও দীর্ঘ হতে পারে। মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেনা ভার্কির মতে, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবহাওয়া আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠছে। ফলে দাবানলের আঞ্চলিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মালয়েশিয়ার বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানী জয়প্রকাশ মুরলিথারান সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ পর্যায় এখনও সামনে আসতে পারে। পিটল্যান্ডের আগুন মাটির নিচে কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বলতে পারে এবং বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় জ্বলে ওঠার আশঙ্কা থাকে।

তবে সেপ্টেম্বরের শেষ অথবা অক্টোবরের দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

Post a Comment

0 Comments