Header Ads Widget

Responsive Advertisement

১৮ দেশে নতুন বাজার খুঁজছে বাংলাদেশ


তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পণ্য ও সেবা রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ

ডেস্ক রিপোর্ট

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়কে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই বহুমুখীকরণের কৌশল হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বিশ্বের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে আলাদা আলাদা রপ্তানি কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘Bangladesh Export Diversification Strategy: Product and Market Diversification Across 18 Key Trading Destinations’ শীর্ষক কর্মশালায় এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়। বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, নির্বাচিত প্রতিটি বাজারের সম্ভাবনা, বিদ্যমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশ কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে পৃথক পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।

কোন ১৮টি বাজারকে লক্ষ্য করা হচ্ছে?

সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে—

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইরান, ব্রাজিল, তুরস্ক, জাপান, কানাডা, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজি।

বর্তমানে এসব বাজারের বেশিরভাগেই বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়। তবে অনেক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। নতুন কৌশলের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য ও সেবার জন্য বাজার তৈরি করা।

শুধু পোশাক নয়, বদলাতে পারে রপ্তানি ঝুড়ি

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈশ্বিক চাহিদা, মূল্য, বাণিজ্যনীতি বা বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নতুন কৌশলে তাই তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রেও গুরুত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক সেবা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় এসেছে।

প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা কৌশল

একটি দেশের জন্য যে পণ্য বা কৌশল কার্যকর, অন্য বাজারে সেটি একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। এ কারণে সরকার প্রতিটি লক্ষ্যবাজারের জন্য আলাদা তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশ্লেষণে বিবেচনা করা হচ্ছে—

  • সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি অংশ;

  • কোন পণ্যের চাহিদা বেশি;

  • বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য কোনগুলো;

  • প্রতিযোগী দেশগুলো কারা;

  • শুল্ক ও অশুল্ক বাধা;

  • বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা;

  • বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা;

  • প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব।

বিশ্লেষণ: কেন এখন রপ্তানি বহুমুখীকরণ গুরুত্বপূর্ণ?

রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য মানে শুধু বেশি দেশে পণ্য বিক্রি করা নয়। এর অর্থ হলো একাধিক পণ্য, একাধিক শিল্প এবং একাধিক বাজারের ওপর একটি ভারসাম্যপূর্ণ রপ্তানি কাঠামো তৈরি করা।

কোনো একটি বাজারে চাহিদা কমে গেলে বা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যে বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হলে অন্য বাজার ও পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে আগের মতো বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সম্ভাব্য সুবিধা

১. রপ্তানি ঝুঁকি কমতে পারে

একটি নির্দিষ্ট বাজার বা পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমলে বৈশ্বিক বাজারের আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব সামাল দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।

২. নতুন শিল্পের বিকাশ হতে পারে

ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও আইটি খাত আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারিত হলে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

৩. কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে

নতুন রপ্তানি খাত গড়ে উঠলে উৎপাদন, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, বিপণন ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশে অ-পোশাক খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পূর্ববর্তী উদ্যোগে লক্ষ্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার তথ্যও বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।

৪. উচ্চমূল্যের পণ্যে যাওয়ার সুযোগ

প্রযুক্তি, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস ও দক্ষতাভিত্তিক সেবার মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাত শক্তিশালী হলে রপ্তানির গুণগত কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

৫. বাংলাদেশের ব্র্যান্ড পরিচিতি বাড়তে পারে

বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার উপস্থিতি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের বাণিজ্যিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

তবে নতুন বাজার নির্ধারণ করলেই রপ্তানি বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

মান ও আন্তর্জাতিক সনদ

অনেক উন্নত বাজারে পণ্যের গুণমান, পরিবেশ, শ্রমনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর মানদণ্ড রয়েছে। এসব শর্ত পূরণে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা

উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতা ছাড়া নতুন বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে।

মূল্য প্রতিযোগিতা

চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ অনেক পণ্যেই শক্তিশালী প্রতিযোগী। ফলে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ নয়, মান, নির্ভরযোগ্যতা ও দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

বাজারভিত্তিক ব্র্যান্ডিং

প্রতিটি দেশের ভোক্তার চাহিদা, সংস্কৃতি, আইন ও বাজার কাঠামো আলাদা। ফলে একই বিপণন কৌশল সব দেশে কার্যকর নাও হতে পারে।

অবকাঠামো ও অর্থায়ন

উৎপাদন বাড়ানো, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, গবেষণা, বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন হবে।

শুধু নতুন বাজার নয়, দরকার নতুন সক্ষমতা

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে এসেছে—রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য শুধু নতুন দেশের তালিকা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক সেবা রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সামনে কী?

১৮টি বাজার নিয়ে সরকারের বিশ্লেষণ শেষ হলে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথা রয়েছে। কোন বাজারে কোন পণ্য বেশি সম্ভাবনাময়, কোথায় কী ধরনের বাধা রয়েছে এবং সেই বাধা কাটাতে কী নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন—এসব বিষয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হবে।

এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো ধীরে ধীরে ‘একটি প্রধান খাত ও কয়েকটি প্রধান বাজারনির্ভর’ কাঠামো থেকে আরও বৈচিত্র্যময় কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

মূল বার্তা

১৮টি লক্ষ্যবাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন ক্রেতা খোঁজার উদ্যোগ নয়; এটি পণ্য, শিল্প ও সেবা—তিন ক্ষেত্রেই রপ্তানির ভিত্তি বিস্তৃত করার একটি বড় কৌশল। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তি, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর।

Post a Comment

0 Comments