ঢাকার অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—এমনকি উড়ালসড়কেও এখন অবাধে দেখা যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সহজ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হলেও অনিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রণহীন ই-রিকশা এখন রাজধানীর যানজট, সড়কশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নিবন্ধন, অনুমোদিত নকশা কিংবা চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা ঘাটতি। অথচ প্রতিদিনই রাজধানীর রাস্তায় বাড়ছে এসব যান। সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ঢাকায় বর্তমানে ইজিবাইকসহ প্রায় ১২ লাখ ই-রিকশা চলাচল করছে। তবে সরকারি কোনো সংস্থার কাছেই এ সংখ্যার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।
কেন বাড়ছে ই-রিকশার সংখ্যা?
ঢাকার পরিবহণ ব্যবস্থায় ই-রিকশার বিস্তার একদিনে হয়নি। ২০১০ সালের পর চীন থেকে আমদানি করা ইজিবাইকের আদলে স্থানীয়ভাবে প্যাডেলচালিত রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি সংযোজন শুরু হয়। ২০১১ সালের দিকে রাজধানীর সড়কে এ ধরনের যান দৃশ্যমান হতে থাকে।
শুরুতে ই-রিকশার চলাচল মূলত অলিগলি ও প্রান্তিক এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে প্রধান সড়কেও। মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি ছিল।
২০২৪ সালের পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়
ই-রিকশার বিস্তার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ১৫ মে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্তের পর চালকদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়।
পরে ১৯ মে তৎকালীন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ করে এসব যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু কোথায়, কতটি এবং কী ধরনের ই-রিকশা চলবে—এ বিষয়ে কার্যকর কাঠামো তৈরি হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার সুযোগে ই-রিকশা অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়কে উঠে আসে। একই সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকে এসব যানবাহনের সংখ্যা।
ঢাকায় আসলে কত রিকশা?
দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩০-৩১ হাজার।
তবে এর বাইরে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক রিকশা অনিবন্ধিত। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের একটি গবেষণায় ঢাকায় রিকশার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ বলা হয়েছিল।
বর্তমানে ই-রিকশার প্রকৃত সংখ্যা কত—এ বিষয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নম্বরপ্লেট ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন নতুন নতুন ই-রিকশা রাজধানীর রাস্তায় নামছে। বিভিন্ন সংগঠনের নামে কথিত নম্বরপ্লেট দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।
ফলে বৈধ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ই-রিকশাকে ঘিরে একটি আলাদা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে।
গত দেড় দশকে ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞা, উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের আদেশ ও বিভিন্ন নীতিমালার ঘোষণা এলেও কোনো উদ্যোগই স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়নি। একদিকে মানুষের স্বল্প দূরত্বে চলাচলের চাহিদা, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক চালক-মালিকের জীবিকা—দুই বাস্তবতার মধ্যে সরকার বারবার কঠোর অবস্থান নিয়েও পরে পিছিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: শুধু অভিযান নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, শুধু অভিযান বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্বল উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অন্যদিকে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. মোসলেহ উদ্দীন হাসান প্যাডেলচালিত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারকে আলাদাভাবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তার মতে, প্যাডেলচালিত রিকশা ঢাকার সংস্কৃতির অংশ হলেও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারকে যান্ত্রিক যান হিসেবে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত ব্যবহারযোগ্য করা এবং বাস পরিবহণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকাকে ৮ জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা
ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়—
প্রতিটি জোনের ই-রিকশার রং আলাদা থাকবে;
এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে যেতে পারবে না;
প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলাচল বন্ধ রাখা হবে;
সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে অভ্যন্তরীণ রুট নির্ধারণ করবে;
অনুমোদিত রিকশা ও চালকের লাইসেন্স থাকা প্রয়োজন হবে;
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের রিকশার চলাচল নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা থাকবে।
সামনে কী?
ই-রিকশা একদিকে লাখো মানুষের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এবং বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল রাজধানীর যানজট, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
তাই প্রশ্ন এখন শুধু ‘ই-রিকশা থাকবে কি থাকবে না’—তা নয়। বরং কতগুলো ই-রিকশা চলবে, কোন রুটে চলবে, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং যানগুলোর নিরাপত্তা মান কী হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের প্রস্তাবিত ৮ জোনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ই-রিকশা ব্যবস্থাপনায় কতটা পরিবর্তন আসে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
0 Comments