জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন, সংবিধান সংশোধন-প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন সংকটকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই একে অপরের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে।
সরকারের অবস্থান হলো, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকলে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত অনুপাতে তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি নেই। অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংসদীয় কমিটির পদ বণ্টনের বিষয়টি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার সঙ্গে শর্তযুক্ত করা উচিত নয়।
কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে মূল বিরোধ কোথায়?
বর্তমান সংসদে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদটি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদে তাদের আসনের অনুপাত বিবেচনায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির প্রায় ২৬ শতাংশ সভাপতির পদ তাদের পাওয়ার কথা। ৩৯টি কমিটির হিসাবে এটি প্রায় ১০টি পদ; এর সঙ্গে সনদে সরাসরি উল্লেখ থাকা চারটি কমিটি যোগ করলে মোট ১৪টি সভাপতির পদ পাওয়ার দাবি দাঁড়ায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাই সনদের এসব প্রস্তাব এখনো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে বিরোধী দলকে ওই সংখ্যক সভাপতির পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।
সরকারের শর্ত—সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে
সংবিধান সংশোধনের জন্য গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচজনের নাম দিতে বলা হলেও তারা তা দেয়নি।
সরকারি দলের বক্তব্য, বিরোধী দল যদি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাহলে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনে তাদের দাবি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরকারের যুক্তি—জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তোলা হলেও সেটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করা একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরি করছে।
বিরোধী দলের অবস্থান কী?
বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি না দেওয়ার সিদ্ধান্তে রয়েছে। তাদের বক্তব্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, সনদে উল্লেখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সংসদে বলেন, সংসদীয় কমিটির সদস্য ও বিভিন্ন পদ বণ্টন নিয়ে আগে ঐকমত্য হয়েছিল। তার মতে, একটি কমিটিতে অংশগ্রহণ করানোর জন্য শর্ত আরোপ করা উচিত নয়।
সংসদের ভেতরে যেমন চাপ, রাজপথেও কর্মসূচি
শুধু সংসদে বক্তব্য ও বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না বিরোধী দল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে আরও সরব হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এরই মধ্যে রাজধানীতে পদযাত্রা করে সংসদের স্পিকারকে স্মারকলিপি দিয়েছে বিরোধী দল।
সংসদের চলতি অধিবেশনের শুরুতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় ১৪ মিনিট ব্যাহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১১ দলের লংমার্চ—রাজপথে নতুন কর্মসূচি
সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ধারাবাহিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
৫ সেপ্টেম্বর: চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ
১৯ সেপ্টেম্বর: রংপুর অভিমুখে লংমার্চ
৩১ অক্টোবর: খুলনা অভিমুখে লংমার্চ
২১ নভেম্বর: সিলেট অভিমুখে লংমার্চ
পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় পর্যায়ে এসব কর্মসূচি শেষে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে লংমার্চের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই সনদে বিরোধী দলের সভাপতির পদ নিয়ে কী বলা আছে?
জুলাই সনদে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের সংসদে আসনের অনুপাত অনুযায়ী বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাবও রয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তন এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে সনদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একটি বাস্তব পার্থক্য রয়ে গেছে।
ডেপুটি স্পিকার নিয়েও মতবিরোধ
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল সেই পদ গ্রহণ করেনি।
সরকারের বক্তব্য, জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের পর সনদ অনুযায়ী পদ বণ্টন করা হবে। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির পদও সংসদে আসনের অনুপাত অনুযায়ী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সমাধানের পথ কি আলোচনায়?
সংসদে বিতর্কের পর অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সরকার ও বিরোধী দলকে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রয়োজনে দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রুদ্ধদ্বার আলোচনা (Closed-door discussion) করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
মূল বিরোধ এক নজরে
| বিষয় | সরকারি দলের অবস্থান | বিরোধী দলের অবস্থান |
|---|---|---|
| সংবিধান সংশোধন | বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন | বিশেষ কমিটিতে অংশ নেবে না |
| সংসদীয় কমিটির সভাপতি | সনদ বাস্তবায়ন/সংশোধনের পর বণ্টন | আসন অনুপাতে পদ পাওয়ার দাবি |
| জুলাই সনদ | বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা চায় | পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি |
| রাজপথের কর্মসূচি | বিরোধী দলের চাপের কৌশল হিসেবে দেখছে | জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে আন্দোলনের পরিকল্পনা |
| সমাধান | সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া | সনদের ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়ন |
সামনে কী হতে পারে?
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হলেও সমঝোতার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
একদিকে সংসদে বিরোধী দলের সরব ভূমিকা, অন্যদিকে রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি—সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার সম্ভাবনাও থাকছে।

0 Comments