চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর সামনে এসেছে কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আগের অভিযোগ ও সরকারি পরিদর্শনের তথ্য।
ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে শুক্রবার সকালে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।
আগেই ধরা পড়েছিল নিরাপত্তার ঘাটতি
সরকারি পরিদর্শনে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কারখানাটিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদন না দেওয়া এবং কর্মঘণ্টা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
পরিদর্শনের পর সংশোধনের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। যথাযথ জবাব না পাওয়ার পর জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মামলায় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও ব্যবস্থাপককে আসামি করা হয়েছে।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাজের একটি ট্যাংকের আশপাশে কাটিংয়ের কাজ চলছিল। কয়েকজন শ্রমিক সেখানে যাওয়ার পর একে একে জ্ঞান হারাতে শুরু করেন। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও কয়েকজন শ্রমিকও গ্যাসের সংস্পর্শে আক্রান্ত হন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জাহাজের ব্যালাস্ট অংশে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বিষাক্ত গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসাসুবিধা প্রস্তুত ছিল না।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর তাদের দল ঘটনাস্থলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শ্রমিকরা এর আগেই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হতে শুরু করেছিলেন।
মালিকপক্ষের বক্তব্য
কারখানার ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, কারখানায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল এবং শ্রমিকদের সেগুলো ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেই কাজে পাঠানো হতো।
তিনি আরও জানান, নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নির্ধারিত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটি গঠন
দুর্ঘটনার কারণ এবং কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল তা খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর আগে এই কারখানায় আরও শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ঘাটতি সংশোধন করা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি যথেষ্ট ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

0 Comments