Header Ads Widget

Responsive Advertisement

১৯৪৭-এর দেশভাগ: স্বাধীনতার উল্লাসের আড়ালে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়



ইতিহাস ডেস্ক

১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তানের—জন্ম হয়। পাকিস্তান ১৪ আগস্ট এবং ভারত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভ করে। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান নিঃসন্দেহে ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু স্বাধীনতার সেই আনন্দের পাশাপাশি উপমহাদেশ প্রত্যক্ষ করে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, গণবাস্তুচ্যুতি, সম্পত্তি হারানো এবং অসংখ্য পরিবারের বিচ্ছেদের ঘটনা।

ব্রিটিশ National Archives-এর দেশভাগ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক নথিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন পরবর্তী গবেষণায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে দেশভাগজনিত মৃত্যুর সম্ভাব্য পরিসর প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত ধরা হয়। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ সে সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ হন এবং বহু মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড তৈরি হয়নি।

কেন ভাগ হলো ভারত?

ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা চলছিল। মুসলিম লীগের পৃথক রাষ্ট্রের দাবি এবং কংগ্রেসের অখণ্ড ভারতের অবস্থানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।

এরপর ব্রিটিশ সরকার ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফকে

British National Archives-এর তথ্য অনুযায়ী, র‍্যাডক্লিফকে সীমান্ত নির্ধারণের জন্য প্রায় ছয় সপ্তাহের মতো সময় দেওয়া হয়েছিল। পাঞ্জাব ও বাংলার মতো মিশ্র জনসংখ্যার অঞ্চলকে ভাগ করে নতুন সীমান্ত তৈরি করতে হয়।

এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে অনেক মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতেন না তাঁদের বাড়ি, জমি কিংবা গ্রাম কোন দেশের অংশ হতে যাচ্ছে।

সীমান্তের আগেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক

দেশভাগের আগের বছরগুলোতেই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তীব্র হয়েছিল। কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ মানুষের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি করে।

১৯৪৭ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পর অনেক ক্ষেত্রে অন্য সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হয়। গ্রাম ও শহরে অগ্নিসংযোগ, হত্যাকাণ্ড, লুটপাট এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা ঘটে।

ফলে বহু পরিবার নিজেদের বহু প্রজন্মের বসতভিটা ছেড়ে অজানা গন্তব্যের দিকে রওনা হতে বাধ্য হয়।

পাঞ্জাব: সবচেয়ে বড় জনস্থানান্তরের কেন্দ্র

পাঞ্জাব ছিল দেশভাগের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার অন্যতম কেন্দ্র। পশ্চিম পাঞ্জাব পাকিস্তানে এবং পূর্ব পাঞ্জাব ভারতে যুক্ত হয়।

Cambridge University Press-এ প্রকাশিত দেশভাগবিষয়ক গবেষণায় পাঞ্জাব অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

পশ্চিম পাঞ্জাবের বিপুলসংখ্যক হিন্দু ও শিখ ভারতে এবং পূর্ব পাঞ্জাবের বিপুলসংখ্যক মুসলিম পাকিস্তানে চলে যান।

মানুষ ট্রেন, গাড়ি, নৌকা ও পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করছিল। কিন্তু অনেক শরণার্থী কাফেলা ও ট্রেনে হামলা হয়। কিছু ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

এই ঘটনাগুলো পরবর্তীকালে ১৯৪৭-এর দেশভাগের ভয়াবহতার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি

দেশভাগের সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েক মিলিয়ন মুসলিম পাকিস্তানে চলে যান। পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লি, বিহার, উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা থেকে মুসলিম পরিবার পাকিস্তানের দিকে চলে যায়।

British National Archives-এ সংরক্ষিত ১৯৪৮ সালের একটি ব্রিটিশ হাইকমিশন রিপোর্টে পাঞ্জাবের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে প্রায় ৪০ লাখ মুসলিমের পশ্চিম পাঞ্জান থেকে সম্পূর্ণ স্থানত্যাগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ভারতের সব মুসলিম পাকিস্তানে চলে যাননি। বিপুলসংখ্যক মুসলিম ভারতেই থেকে যান এবং স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে জীবন শুরু করেন।

হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি

পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ববঙ্গের বহু হিন্দু পরিবার দেশভাগের পর ভারতে চলে আসে।

বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে হিন্দুদের অভিবাসন ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৪৭ সালের পরও বিভিন্ন সময়ে নতুন করে মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে।

১৯৫১ সালের ভারতের জনগণনা অনুযায়ী, পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে আগত প্রায় ২৫ লাখ ২৩ হাজার শরণার্থী তখন পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ৬১ হাজার পশ্চিমবঙ্গে বসতি স্থাপন করেন। বাকিরা আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।

অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের ক্ষেত্রে দেশভাগের বাস্তুচ্যুতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল।

শিখ জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত

পাঞ্জাব ভাগের ফলে শিখ জনগোষ্ঠীও ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়। পশ্চিম পাঞ্জাব পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় সেখানকার বহু শিখ পরিবার পূর্ব পাঞ্জাব ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে পূর্ব পাঞ্জাবের বিপুলসংখ্যক মুসলিম পাকিস্তানে চলে যান।

ফলে একই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক জনস্থানান্তর ঘটে। Cambridge-এর গবেষণায় পাঞ্জাবে প্রায় ১ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতির যে হিসাব পাওয়া যায়, তা এই বিপর্যয়ের মাত্রা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার পরিস্থিতি ছিল দীর্ঘস্থায়ী

পাঞ্জাবের মতো বাংলায় তাৎক্ষণিকভাবে একই মাত্রার গণস্থানান্তর দেখা না গেলেও বাংলার দেশভাগের প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী।

১৯৪৬ সালের কলকাতা ও নোয়াখালীর সহিংসতা এবং বিহারের পাল্টা সহিংসতার পর সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।

১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়।

এরপর পূর্ববঙ্গ থেকে বহু হিন্দু পরিবার ভারতে চলে আসে। একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও কিছু মুসলিম পরিবার পূর্ববঙ্গে চলে যায়।

১৯৫১ সালের ভারত ও পাকিস্তানের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু নতুন করে নথিভুক্ত হয়।

নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা

দেশভাগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল নারী ও শিশুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতা।

LUMS Digital Archive-এর Partition Abductions 1947 প্রকল্পে ভারত ও পাকিস্তানের উভয় পাশে হিন্দু, মুসলিম ও শিখ নারী ও শিশু অপহরণের নথি সংরক্ষিত রয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেশভাগের সময় প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ নারী অপহরণ, ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিয়ে বা ধর্মান্তরের মতো সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন বলে অনুমান করা হয়েছে।

এই সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই এটিকে চূড়ান্ত সংখ্যা নয়, বরং ঐতিহাসিক অনুমান হিসেবে উল্লেখ করা উচিত।

শিশুরাও এই বিপর্যয় থেকে রেহাই পায়নি। শরণার্থী কাফেলা, ট্রেন ও সহিংসতার মধ্যে বহু শিশু পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে শিশুদের নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার নির্ভরযোগ্য সর্বভারতীয় মোট সংখ্যা পাওয়া যায় না।

খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী

দেশভাগের প্রধান সহিংসতা মুসলিম, হিন্দু ও শিখ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হলেও খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরাও সামগ্রিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রভাবের বাইরে ছিলেন না।

তবে তাঁদের জন্য পৃথকভাবে নিহত বা বাস্তুচ্যুতির নির্ভরযোগ্য সর্বভারতীয় সংখ্যা নেই। তাই এই জনগোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার না করাই তথ্যগতভাবে সঠিক।

কত মানুষ নিহত হয়েছিল?

১৯৪৭-এর দেশভাগে নিহতের সংখ্যা আজও বিতর্কিত।

British National Archives প্রায় ১০ লাখ মৃত্যুর হিসাব উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ইতিহাসবিদের গবেষণায় এই সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ হলো সে সময়কার প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। বহু মানুষ নিখোঁজ হন, বহু মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি।

তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে “এতজনই নিহত” বলা ইতিহাসের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রায় দেড় কোটি মানুষের ঘরবদল

দেশভাগের সবচেয়ে বড় মানবিক ফল ছিল গণবাস্তুচ্যুতি।

Cambridge University Press-এর গবেষণায় ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ফলে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতির হিসাব পাওয়া যায়। অন্য গবেষণায় এই সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি পর্যন্ত ধরা হয়েছে।

মানুষ কেউ ট্রেনে, কেউ নৌকায়, কেউ গরুর গাড়িতে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করেন।

অনেকের কাছে সঙ্গে নেওয়ার মতো ছিল সামান্য কাপড়, কিছু খাবার ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। পেছনে পড়ে থাকে বাড়ি, জমি, দোকান, ব্যবসা এবং বহু প্রজন্মের স্মৃতি।

সম্পত্তি হারানোর ইতিহাস

দেশভাগের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাড়িঘর, জমি, দোকান ও ব্যবসা ছেড়ে চলে যান। ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই পরে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হয়।

তবে মোট কত পরিবার কত টাকার সম্পত্তি হারিয়েছিল—এর কোনো নির্ভরযোগ্য একক সর্বভারতীয় হিসাব নেই। তাই নির্দিষ্ট আর্থিক অঙ্ক উল্লেখ করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

সহিংসতার দায় কি এক সম্প্রদায়ের?

১৯৪৭-এর ইতিহাসকে কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা হিসেবে দেখলে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

পাঞ্জাব, বাংলা, বিহার ও দিল্লির পরিস্থিতি এক ছিল না। বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম, হিন্দু ও শিখ—তিন সম্প্রদায়ের মানুষই বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হন।

LUMS Digital Archive-এর সংরক্ষিত নথিগুলোতেও তিন সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের উভয় পাশ থেকে অপহরণের তথ্য পাওয়া যায়।

তাই দেশভাগের সহিংসতা বোঝার ক্ষেত্রে অঞ্চল, সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা

দেশভাগের সীমান্ত দ্রুত নির্ধারণ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

British National Archives-এর তথ্য অনুযায়ী, সিরিল র‍্যাডক্লিফকে সীমান্ত নির্ধারণের জন্য মাত্র প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার আগে সীমান্তরেখা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্বাধীনতার পর সীমান্ত ঘোষণার ফলে অনেক মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও যুক্ত হয়ে মানবিক বিপর্যয়কে আরও তীব্র করে।

গান্ধীর শান্তি প্রচেষ্টা

দেশভাগের সহিংসতা থামাতে মহাত্মা গান্ধী বিভিন্ন এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কলকাতা ও দিল্লিতে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আহ্বান জানান এবং সহিংসতা বন্ধে অনশন করেন।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে দিল্লিতে তাঁর শেষ দিকের অন্যতম অনশন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

দেশভাগের মাত্র কয়েক মাস পর তাঁর হত্যাকাণ্ড উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।

দেশভাগের ক্ষত কতদিন ছিল?

দেশভাগের বাস্তুচ্যুতি ১৯৪৭ সালের মধ্যেই শেষ হয়নি। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অভিবাসন বহু বছর ধরে চলেছে।

১৯৫১ সালের ভারতের জনগণনায় পূর্ববঙ্গ থেকে আসা প্রায় ২৫ লাখ ২৩ হাজার শরণার্থী নথিভুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়ে।

ফলে দেশভাগ শুধু মানচিত্র পরিবর্তন করেনি; এটি ভারত, পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা, নগরায়ণ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

ইতিহাসের শিক্ষা

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল একই সঙ্গে স্বাধীনতার অর্জন এবং এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা।

প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি, লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ নারীর ওপর অপহরণ ও যৌন সহিংসতার ঐতিহাসিক অনুমান, বিপুল সম্পত্তিহানি এবং অসংখ্য পরিবারের বিচ্ছেদ—সব মিলিয়ে দেশভাগ উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরতম মানবিক ক্ষতগুলোর একটি।

এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন সাধারণ মানুষ—মুসলিম, হিন্দু ও শিখসহ বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরাও সামগ্রিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন না।

১৯৪৭-এর ইতিহাস তাই শুধু দুটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের ঘর হারানোর, স্বজন হারানোর, পরিচিত সমাজ হারানোর এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে জীবন পুনর্গঠনের ইতিহাস।

Post a Comment

0 Comments