Header Ads Widget

Responsive Advertisement

৬ মাসে মালয়েশিয়ায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী, সঙ্গে ১০ হাজার ‘জিরো কস্ট’—কোন খাতে কতজন?


নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলতে যাচ্ছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে পর্যায়ক্রমে কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং ছয় মাসের মধ্যে ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

রোববার সচিবালয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি জানান, এসব কর্মী মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্ত কোম্পানির মাধ্যমে যাবেন। এর বাইরে আরও ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিনা খরচে বা ‘জিরো কস্টে’ নেওয়ার কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া।

তবে নতুন করে নেওয়া ২ লাখ কর্মীর মধ্যে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা বা অন্য কোনো খাতে কতজনের কোটা থাকবে—এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে এবার নিয়োগের খাতভিত্তিক কোটা প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের প্রধান কর্মক্ষেত্র কোনগুলো?

অতীতের নিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের বড় অংশ কাজ করেছেন নির্মাণ, উৎপাদন, প্ল্যান্টেশন/কৃষি এবং সেবা খাতে

২০২২–২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল–এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্ল্যান্টেশন, নির্মাণ ও উৎপাদন খাত বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতে বড়সংখ্যক কর্মী রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্ভাব্য প্রধান খাত

১. নির্মাণ খাত
বিল্ডিং নির্মাণ, অবকাঠামো প্রকল্প, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কাজে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের।

২. উৎপাদন ও কারখানা
ম্যানুফ্যাকচারিং, শিল্পকারখানা ও উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

৩. প্ল্যান্টেশন ও কৃষি
পাম অয়েলসহ বিভিন্ন কৃষি ও প্ল্যান্টেশন কার্যক্রমে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১২–২০১৫ সালের বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সরকারি ব্যবস্থায় বিশেষভাবে প্ল্যান্টেশন কর্মী পাঠানো হয়েছিল।

৪. সেবা খাত
পরিষেবা ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি রয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়োগে এ খাতের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নতুন চাহিদাপত্র প্রকাশের পর স্পষ্ট হবে।

৫. নিরাপত্তা ও পরিচর্যা খাত
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে নিরাপত্তাকর্মী, কেয়ারগিভার ও নার্স নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে নতুন ২ লাখের মধ্যে এসব পেশায় নির্দিষ্ট কতজন নেওয়া হবে, তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

নতুন ২ লাখের কোটা কোথায়?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বর্তমান ঘোষণায় মোট সংখ্যা ২ লাখ এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার ‘জিরো কস্ট’ কর্মীর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্মাণে কত, কারখানায় কত, কৃষিতে কত কিংবা সেবা খাতে কত—এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

অর্থাৎ এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যায়:

বিষয়ঘোষিত সংখ্যা
তালিকাভুক্ত কোম্পানির মাধ্যমে কর্মী২ লাখ
অতিরিক্ত জিরো-কস্ট কর্মী১০ হাজার
মোট সম্ভাব্য কর্মী২ লাখ ১০ হাজার
সময়সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ৬ মাস
খাতভিত্তিক কোটাএখনো প্রকাশ হয়নি

অতীতেও বড় শ্রমবাজার ছিল মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি শ্রমবাজার। সরকারি ও গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে সংখ্যাটি দ্রুত বাড়ে।

২০০৭ ও ২০০৮ সালে দুই বছরেই প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন বলে সরকারি তথ্যভিত্তিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।

২০০৪ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এই শ্রমবাজারের ইতিহাস শুধু সাফল্যের নয়; এর সঙ্গে রয়েছে একাধিকবার বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালচক্র ও নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক।

২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৪—বারবার বন্ধ হয়েছে বাজার

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের ইতিহাসে কয়েক দফা বড় সংকট এসেছে।

২০০৯ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালের শেষদিকে আবার তা খোলে। এরপর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে আবারও নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নতুন সমঝোতা স্মারকের পর ২০২২ সালে আবার কর্মী পাঠানো শুরু হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, কর্মী শোষণ ও নিয়োগসংক্রান্ত নানা অভিযোগের পর বাজার আবার বন্ধ হয়ে যায়।

অতীতের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ

২০২২–২৪ সময়কালে সীমিতসংখ্যক বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে স্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ ওঠে।

এবার ‘জিরো কস্ট’ কর্মীদের গুরুত্ব কেন বেশি?

অতিরিক্ত ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে নেওয়ার ঘোষণা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কারণ বিদেশে যাওয়ার সময় কর্মীদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অভিবাসন ব্যয়। অতীতে মালয়েশিয়াগামী অনেক কর্মী নিয়োগের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। OECD-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও ২০২২–২৩ সময়কালে বাংলাদেশি কর্মীদের কাছ থেকে উচ্চ নিয়োগ ব্যয়ের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই ‘জিরো কস্ট’ কর্মীদের ক্ষেত্রে বাস্তবে—

  • কোনো অভিবাসন ফি দিতে হবে কি না,

  • বিমানভাড়া কে বহন করবে,

  • মেডিকেল ও ভিসা খরচ কে দেবে,

  • নিয়োগকর্তা কী কী ব্যয় বহন করবে,

এসব বিষয় লিখিতভাবে স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ।

এবার কীভাবে নিয়োগ হলে আগের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে?

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বড় সংখ্যা ঘোষণা করলেই হবে না—নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে:

প্রথমত, কোন খাতে কতজন কর্মী প্রয়োজন তার প্রকাশ্য কোটা।

দ্বিতীয়ত, কোন কোম্পানি কর্মী নেবে এবং তাদের চাকরির চুক্তি যাচাই।

তৃতীয়ত, কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে তা স্পষ্ট করা।

চতুর্থত, রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রকাশ করা।

পঞ্চমত, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর কর্মী যেন প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন পান, তা নিশ্চিত করা।

কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও

দুই লাখ কর্মীর নতুন সুযোগ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পারে।

কিন্তু অতীতের মতো যদি—

  • অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়,

  • চাকরির নামে ভিন্ন কাজে পাঠানো হয়,

  • কর্মী পৌঁছে চাকরি না পান,

  • নিয়োগে সীমিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়,

  • অথবা খাতভিত্তিক চাহিদা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ না করা হয়,

তাহলে নতুন সুযোগটি আবারও সংকটে পরিণত হতে পারে।

২ লাখ নয়, নজর থাকবে ২ লাখ ১০ হাজারে

নতুন ঘোষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—ছয় মাসে ২ লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও ১০ হাজার কর্মীকে জিরো কস্টে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি:

কোন খাতে কতজন?
কোন কোম্পানি কতজন নেবে?
কর্মীর মোট অভিবাসন ব্যয় কত?
১০ হাজার ‘জিরো কস্ট’ কর্মীর জন্য কারা আবেদন করতে পারবেন?
রিক্রুটিং এজেন্সি কীভাবে নির্বাচন হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত প্রকাশ্যে আসবে, ততই কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তা কমবে।

শেষ কথা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার দরজা খুলছে। কিন্তু এই বাজারের পুরোনো ইতিহাসও সতর্ক করে—বড় সংখ্যার চেয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ, সঠিক চাকরি, ন্যায্য খরচ এবং কর্মীর অধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ছয় মাসে ২ লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ঘটনা হতে পারে। এখন অপেক্ষা খাতভিত্তিক কোটা, নিয়োগের নিয়ম এবং ‘জিরো কস্ট’ ১০ হাজার কর্মীর বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশের।

Post a Comment

0 Comments