দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ইউনিয়নে বিএনপির তিন থেকে চারজন পর্যন্ত নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত একজনকে দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়ে বাকিদের তাঁর পক্ষে আনা বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বছরের শেষেই ইউপি ভোটের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন (ইসি) বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে যেগুলো নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী, সেগুলোতে ধাপে ধাপে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তফসিল ও ভোটের মধ্যে সাধারণত প্রায় দুই মাস সময় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নভেম্বরের শেষ দিকে ভোট শুরু করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এক ইউনিয়নেই বিএনপির নয় সম্ভাব্য প্রার্থী
ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে পরিস্থিতি বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সেখানে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির নেতা ও সমর্থক মিলিয়ে অন্তত নয়জন আগ্রহী বা সক্রিয় রয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে ইউনিয়ন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান নেতারাও রয়েছেন। বিএনপি ঘরানার কয়েকজন প্রবাসীও চেয়ারম্যান পদে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যে এলাকায় পোস্টার লাগিয়ে প্রচার শুরু করেছেন।
একক প্রার্থীর নীতিতে জোর দিচ্ছে বিএনপি
বিএনপির নেতৃত্ব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় দলীয় ঐক্য বজায় রেখে একজন প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও দলটির নেতারা জানিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মাঠে একাধিক নেতা সক্রিয় হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সবাইকে একজনের পক্ষে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
‘জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য’ প্রার্থীকে সমর্থনের কথা
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে যাঁদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, দল তাঁদের সমর্থন করবে—এটাই বিএনপির ঘোষিত অবস্থান।
তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের আশঙ্কা, প্রার্থিতা নিয়ে সমঝোতা না হলে নির্বাচনের আগেই স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিরোধ তৈরি হতে পারে। এতে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
ইউপি নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক প্রস্তুতিই নয়, সময় নির্ধারণেও ইসিকে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হচ্ছে।
বন্যা, দুর্গাপূজা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আগামী বছরের রমজান ও ঈদের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এ কারণে ভোট আয়োজনের উপযুক্ত সময় তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে আসছে।
ইসি জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে চলতি বছরের মধ্যেই ভোটের কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে কমিশন।
আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আলোচনায়
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতাদের আলোচনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিও এসেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ধারণা, তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী বিভিন্নভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে এখনো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিএনপিকে শুধু নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিএনপির সামনে এখন মূল পরীক্ষা
ইউপি নির্বাচন এখনো তফসিলের পর্যায়ে না গেলেও মাঠের চিত্র বলছে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে।
বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীকে কীভাবে সমঝোতায় এনে একজনকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া যায়। সময়মতো এই সমন্বয় করতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে বিভক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়নে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ ভোট আয়োজন করা।
এক নজরে
নির্বাচন: ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)
তফসিল: এখনো ঘোষণা হয়নি
ইসির পরিকল্পনা: বছরের শেষ দিকে ভোট শুরু
সম্ভাব্য তফসিল: সেপ্টেম্বর
সম্ভাব্য ভোট শুরুর সময়: নভেম্বরের শেষ দিকে
বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ: একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে একজনকে চূড়ান্ত করা
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী: জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি
প্রধান রাজনৈতিক বিষয়: দলীয় ঐক্য ও একক প্রার্থী
ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির মাঠে একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা—শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে কে টিকবেন, আর কারা সরে দাঁড়াবেন, সেটিই এখন স্থানীয় রাজনীতির বড় প্রশ্ন।

0 Comments