Header Ads Widget

Responsive Advertisement

গাজায় কি ‘সিরিয়া মডেল’ প্রয়োগ করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র? হামাসকে ঘিরে নতুন সমীকরণ


হামাসের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের সরাসরি যোগাযোগ এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে আলোচনাকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র কি সিরিয়ায় সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক রূপান্তরের মতো কোনো মডেল গাজায় প্রয়োগের চেষ্টা করছে?

গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, হামাস ও ইসরায়েলের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। মিসরের এল-আলামিনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়ার বৈঠক সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। বৈঠকে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

এর পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটন কি হামাসকে সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পথ খুঁজছে?

কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কুশনার–হামাস বৈঠক?

হামাসকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে মার্কিন প্রতিনিধির সঙ্গে সংগঠনটির শীর্ষ নেতার সরাসরি বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, হামাসের অস্ত্র, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে সমাধান খুঁজতে ওয়াশিংটনকে হামাসের সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে যোগাযোগ রাখতেই হচ্ছে।

এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে হামাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ মূলত কাতার ও মিসরের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে জিম্মি মুক্তির বিষয়কে কেন্দ্র করে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হামাসের অনানুষ্ঠানিক সরাসরি যোগাযোগের খবর সামনে আসে।

‘সিরিয়া মডেল’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

সিরিয়ায় আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক রূপান্তরকে ঘিরে যে মডেল তৈরি হয়েছে, সেটিই এখানে তুলনার বিষয়।

সশস্ত্র আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রবেশ, আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠা—সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহে এমন একটি পরিবর্তন দেখা গেছে।

গাজায় একই ধরনের কোনো রূপান্তর ঘটানো সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

হামাসকে কী করতে বলছে ওয়াশিংটন?

বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, গাজার প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানো এবং একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে শাসনভার দেওয়ার মতো বিষয় উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে হামাসকে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ থেকে দূরে রেখে মিসর, কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে হামাসের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। কারণ সংগঠনটির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সশস্ত্র প্রতিরোধের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।

ইসরায়েলকে কেন চাপে পড়তে হচ্ছে?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য ছিল হামাসকে ধ্বংস করা। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

উল্টো যুদ্ধের প্রভাব গাজার বাইরে লেবানন, ইয়েমেন ও ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততাও বেড়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা ও আইনি চাপও বেড়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চাপ ক্রমেই বাড়ছে—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।

হামাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ কি নতুন?

পুরোপুরি নয়।

হামাসের সঙ্গে মার্কিন যোগাযোগের ইতিহাস কয়েক দশকের। তবে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর প্রকাশ্য যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় কাতার ও মিসরের মতো মধ্যস্থতাকারীরা যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেছে।

গাজা যুদ্ধ সেই পুরোনো সমীকরণে পরিবর্তন এনেছে। জিম্মি মুক্তি, যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হামাসকে সরাসরি আলোচনার বাইরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

কেন খলিল আল-হাইয়া গুরুত্বপূর্ণ?

হামাসের নেতৃত্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর খলিল আল-হাইয়া আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার ও ইসমাইল হানিয়ার মৃত্যুর পর হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় আল-হাইয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে তাঁর উপস্থিতি কেবল একটি বৈঠকের ঘটনা নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

কিন্তু গাজায় কি সত্যিই সিরিয়ার মডেল কাজ করবে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সিরিয়া ও গাজার পরিস্থিতি এক নয়। সিরিয়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র; সেখানে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক রূপান্তরের পথে এগিয়েছে।

গাজা অন্য বাস্তবতা। এটি দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ, ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। ফলে হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করানো বা রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করা অনেক বেশি জটিল।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সিরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কৌশল নেওয়া সম্ভব হলেও গাজায় তার সরাসরি পুনরাবৃত্তি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।

ইসরায়েলের মধ্যেও রয়েছে সংশয়

অন্যদিকে ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক মহলও সিরিয়ার মডেল নিয়ে সতর্ক।

তাদের আশঙ্কা, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করলেই তার আদর্শ বা সামরিক সক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। হামাস ও হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তারা মনে করে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি কোনো গোষ্ঠী সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখলে ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়।

ওয়াশিংটনের সামনে বড় কূটনৈতিক হিসাব

গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে।

সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য রোডম্যাপকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকারের ভেতরে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসকে ঘিরে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে।

ইরানও হামাসসহ আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি হারাতে চাইবে না। ফলে গাজা নিয়ে যেকোনো রাজনৈতিক সমাধানকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও বড় ভূমিকা রাখবে।

শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে গাজা?

সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে একটি মধ্যবর্তী রাজনৈতিক সমাধান—যেখানে হামাস সরাসরি গাজার প্রশাসনের সামনের সারিতে থাকবে না, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকেও অদৃশ্য হবে না।

একটি টেকনোক্র্যাট বা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের হাতে গাজার শাসনভার দেওয়ার পাশাপাশি হামাসের সামরিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা হতে পারে।

তবে এই সমীকরণ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো হামাসের অস্ত্র, ইসরায়েলের নিরাপত্তা দাবি, ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ঐক্য এবং গাজার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো

অর্থাৎ, ‘সিরিয়া মডেল’ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও গাজায় তার বাস্তব প্রয়োগ হবে কি না—এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

Post a Comment

0 Comments