নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি | ৩১ আগস্ট ২০২৬
ভরা মৌসুমেও নরসিংদীর সবজির বাজারে স্বস্তি নেই। টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কমেছে উৎপাদন। একই সঙ্গে চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ কম থাকায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়েছে।
পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে বাড়তি দামে সবজি কিনতে গিয়ে চাপ বেড়েছে সাধারণ ক্রেতাদের সংসারে। অন্যদিকে উৎপাদন ভালো না থাকায় দাম বাড়লেও সব কৃষক সেই বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন না।
পাইকারি হাটে ভোর থেকেই ক্রেতাদের ভিড়
শনিবার নরসিংদীর বিভিন্ন পাইকারি সবজির হাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে শত শত পাইকার সবজি কিনতে আসছেন। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে দরদাম করে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সবজি সংগ্রহ করছেন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় তাদের আগের চেয়ে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ছে।
বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত সবজিখেত
কৃষকেরা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক জমিতে পানি জমে ফসল নষ্ট হয়েছে। কোথাও আবার উৎপাদন কমে গেছে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারের সরবরাহে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সবজি না পাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা—উভয় বাজারেই দাম বেড়েছে।
তবে কৃষকদের একাংশ বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় দাম বাড়লেও তাঁদের হাতে বিক্রির মতো পর্যাপ্ত সবজি নেই। ফলে বাড়তি বাজারদরের পুরো সুবিধা তাঁরা নিতে পারছেন না।
মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়েও ক্রেতাদের অভিযোগ
সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎপাদন কমে যাওয়ার সুযোগে বাজারের একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। কৃষকের কাছ থেকে যে দামে সবজি কেনা হচ্ছে, খুচরা বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
এতে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
নরসিংদীর সবজি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে
জেলায় রাধাগঞ্জ, চরসুবুদ্দি, পুটিয়া, মাহমুদাবাদ নামাপাড়া, জংলী শিবপুর, গোকুলনগর, বারৈচা, নারায়ণপুর ও মরজালসহ বিভিন্ন এলাকায় সপ্তাহজুড়ে পর্যায়ক্রমে সবজির হাট বসে।
রায়পুরা, বেলাব ও শিবপুর উপজেলায় বছরজুড়েই বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়। এসব এলাকার উৎপাদিত সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি নরসিংদীর কিছু সবজি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে কোন সবজির কত দাম?
স্থানীয় পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি—
আলু: ২৫ টাকা
পেঁয়াজ: ৪০–৫০ টাকা
লম্বা শিম: ৯০–১০০ টাকা
বেগুন: ৮০–৯০ টাকা
ঢ্যাঁড়স: ৭০–৮০ টাকা
কাঁচা মরিচ: ২৫০ টাকা
টমেটো: ১০০–১১৫ টাকা
কাঁকরোল: ৬০–৭০ টাকা
ধনেপাতা: ৪০–৫০ টাকা
পটোল: ৭০ টাকা
শসা: ৬০ টাকা
করলা: ৮০–৯০ টাকা
চিচিঙ্গা: ৭০–৮০ টাকা
গাজর: ১০০ টাকা
পেঁপে: ৩০ টাকা
চালকুমড়া: ৪০ টাকা
মিষ্টি লাউ: ৫০–৮৫ টাকা
লাউ: ৬০–৭০ টাকা
ফুলকপি: ৫০–৫৫ টাকা
পুঁইশাক, লালশাক ও ধনেপাতার মতো কিছু শাক ১৫–২৫ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে আরও বেশি দাম
খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি—
আলু: ৩৫ টাকা
পেঁয়াজ: ৫৫–৬০ টাকা
ঢ্যাঁড়স: ৯০–১০০ টাকা
বেগুন: ১০০ টাকা
লম্বা শিম: ১০০–১২০ টাকা
কাঁচা মরিচ: ৩৩০ টাকা
টমেটো: ১৩০ টাকা
শসা: ৭০–৮০ টাকা
পেঁপে: ৩৫ টাকা
লাউ: ৮০–৯০ টাকা
মিষ্টি লাউ: ৭৫–৯০ টাকা
বিভিন্ন ধরনের শাক বিক্রি হচ্ছে ২০–৩০ টাকা আঁটি দরে।
‘বেশি দামে কিনছি, তাই বেশি দামে বিক্রি’
পাইকারি ব্যবসায়ী সজীব মিয়া বলেন, নরসিংদীর বিভিন্ন হাট থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বর্তমানে তাঁদের বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
লাভের আশায় কৃষক, আবার বৃষ্টির ক্ষতিও
রায়পুরার কৃষক রিপন মিয়া জানান, ১৪ শতক জমিতে ঢ্যাঁড়স চাষ করতে তাঁর প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি ৮ কেজি ঢ্যাঁড়স ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। এবার কিছুটা লাভের আশা করছেন তিনি।
তবে উত্তর বাখরনগর গ্রামের কৃষক স্বপন বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি জানান, ১৬ শতক জমিতে সবজি চাষে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করলেও টানা বৃষ্টিতে তাঁর ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাজারে দাম বাড়লেও উৎপাদন না থাকায় তিনি লাভের সুবিধা পাচ্ছেন না।
কৃষকের খরচ কমানোর দাবি
কৃষক কালাম, নয়ন মিয়া, স্বপন বিশ্বাস, আব্দুল মালেক, শ্যামল ও কাওছারসহ স্থানীয় কৃষকেরা কৃষি উপকরণের ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, কৃষিযন্ত্র, ডিজেল, সার ও কীটনাশকের দাম কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি লাভ করতে পারবেন।
‘নরসিংদীর সবজির চাহিদা ব্যাপক’
দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা পাইকার আব্দুর রহিম বলেন, নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সবজির হাট বসে। এখানকার সবজির মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন আড়তে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
খুচরা বিক্রেতা কবির মিয়া বলেন, হাটে পর্যাপ্ত সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আজিজুল হক বলেন, এ বছর নরসিংদীতে সবজির আবাদ বেড়েছে। জেলার উৎপাদিত সবজির মান ভালো হওয়ায় দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
তিনি জানান, সবজির উৎপাদন ও রপ্তানি আরও বাড়াতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
সামনে কী হতে পারে?
কৃষি ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছু সবজির বাজারদর চাপে থাকতে পারে। তবে নতুন করে উৎপাদন বাড়লে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের মধ্যবর্তী স্তরে মূল্য সংযোজন—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত খুচরা দামে প্রভাব ফেলে। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও নজর দেওয়ার দাবি রয়েছে।
এক নজরে
প্রধান কারণ: টানা বৃষ্টিতে উৎপাদন কমে যাওয়া
প্রভাব: বাজারে সরবরাহ কমেছে, দাম বেড়েছে
সবচেয়ে বেশি আলোচিত পণ্য: কাঁচা মরিচ, টমেটো, শিম, বেগুন
পাইকারি কাঁচা মরিচ: ২৫০ টাকা/কেজি
খুচরা কাঁচা মরিচ: ৩৩০ টাকা/কেজি
নরসিংদীর প্রধান উৎপাদন এলাকা: রায়পুরা, বেলাব ও শিবপুর
সরবরাহ: ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা
রপ্তানি: কিছু সবজি বিদেশেও যাচ্ছে

0 Comments