Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কম বেতন, ১২–১৬ ঘণ্টার ডিউটি—বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের জীবন যেন ‘নিরাপত্তাহীন’


ঢাকা: ব্যাংক, এটিএম বুথ, করপোরেট অফিস, শপিংমল, শিল্পকারখানা কিংবা কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান—প্রতিদিনের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা। কিন্তু অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও তাঁদের নিজেদের কর্মজীবনেই রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা।

কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ছুটির সংকট, অতিরিক্ত সময়ের কাজ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং চাকরির নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যায় দিন কাটছে দেশের বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মীর। সংশ্লিষ্ট খাতের সংগঠনের হিসাবে, সারা দেশে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি।

৮–১২ হাজার টাকায় সংসার চালানোর চেষ্টা

নিরাপত্তাকর্মীদের বড় একটি অংশ আট ঘণ্টার দায়িত্বের জন্য মাসে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পান। ওভারটাইম করলে অনেকের মাসিক আয় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কিছু প্রতিষ্ঠানে বেতন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা হলেও এমন কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

২০২২ সালে বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ন্যূনতম মজুরি ৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং জেলা শহর ও অন্যান্য এলাকায় ৯ হাজার ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে করা সাক্ষাৎকারে অনেকেই এর চেয়েও কম বেতন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ

শুধু কম বেতন নয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টাও নিরাপত্তাকর্মীদের অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক কর্মী প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

কাজের ধরন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় একই জায়গায় অবস্থান করতে হয়। এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মীদের ক্ষেত্রে দায়িত্বস্থল ছেড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য যাওয়ার সুযোগও থাকে না। ফলে খাবার, নামাজ, টয়লেট ও বিশ্রামের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়।

শ্রম বিধিমালায় একজন কর্মীকে একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত সময় কাজ করার এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান বছরে এক দিনের জন্যও ছুটি দেয় না

দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ছুটির অভাব। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের নিয়মিত ছুটি দেওয়ার বদলে বছরের পর বছর টানা দায়িত্ব পালন করায়। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানে বছরে এক দিনের জন্যও ছুটি দেওয়া হয় না বলে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ফলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পরও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো কিংবা শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি দূর করার সুযোগ পান না অনেক কর্মী। বিশেষ করে পর্যাপ্ত বিকল্প কর্মী না থাকলে একজন নিরাপত্তাকর্মীর ওপর দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের চাপ তৈরি হয়।

ছুটির সুযোগ না থাকায় কর্মীদের কর্মজীবন যেমন কঠিন হয়ে ওঠে, তেমনি দীর্ঘদিনের ক্লান্তি তাঁদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, নিরাপত্তার মতো দায়িত্বশীল পেশায় কর্মীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না থাকাও প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

আইনে মজুরি ও সুবিধার কথা থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র

সংশোধিত শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মী সংশ্লিষ্ট খাতের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম পাওয়ার কথা নয়। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিতে যে বেতন ও ভাতা নির্ধারণ করা হয়, কর্মীকেও সেই অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে বাস্তবে এসব নিয়ম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রম বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বেসরকারি নিরাপত্তা খাতে কার্যকর সরকারি তদারকি এখনও দুর্বল।

ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন নিয়ে ভিন্ন নির্দেশনা

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের একটি প্রজ্ঞাপনে বিভাগীয় শহরে ব্যাংকের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও অফিস সহায়কদের মতো পদে ন্যূনতম বেতন-ভাতা ২৪ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা জানিয়েছিল। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বেতন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আউটসোর্স কর্মীদের সঙ্গে একই ধরনের স্থায়ী কর্মীদের বেতন-ভাতায় বড় ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

কেন এই পেশা ছাড়তে চান অনেকে?

নিরাপত্তাকর্মীদের একটি অংশ এই পেশাকে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে দেখতে চান না। বিশেষ করে তরুণ কর্মীদের মধ্যে অন্য চাকরির সুযোগ পেলে পেশা পরিবর্তনের আগ্রহ বেশি।

এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—

  • তুলনামূলক কম বেতন

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা

  • নিয়মিত ছুটির অভাব

  • রাতের দায়িত্ব ও ঘুমের সমস্যা

  • পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকা

  • টয়লেট ব্যবহারে অসুবিধা

  • রোদে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন

  • ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি

নারী নিরাপত্তাকর্মীদের বাড়তি সমস্যা

সাম্প্রতিক সময়ে শপিংমল, করপোরেট অফিস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি বেড়েছে। তবে তাঁদেরও রয়েছে আলাদা কিছু চ্যালেঞ্জ।

কর্মক্ষেত্রে পোশাক পরিবর্তনের আলাদা জায়গা না থাকা, দূরের স্থানে দায়িত্ব পালনের সময় খাবার ও টয়লেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন অসুবিধার কথা জানিয়েছেন নারী নিরাপত্তাকর্মীরা। অনেকের পক্ষে অতিরিক্ত সময় কাজ করাও সম্ভব হয় না।

নিবন্ধন ও তদারকিতে প্রশ্ন

দেশে বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা খাতের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। পরবর্তী সময়ে এই খাতে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন প্রয়োজন। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী সরবরাহের ক্ষেত্রে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিবন্ধনের বিষয়ও রয়েছে।

তবে নিবন্ধন ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কী করা দরকার?

শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য শুধু ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলেই হবে না; সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

তাঁদের মতে, নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়োগ, বেতন, কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক ছুটি, ওভারটাইম, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যের নিরাপত্তা যাঁদের দায়িত্ব, তাঁদের নিজেদের কর্মজীবন যদি অনিরাপদ থাকে, পর্যাপ্ত বেতন ও বিশ্রাম না থাকে, এমনকি বছরে এক দিনের ছুটিও না মেলে—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, দেশের বিশাল এই নিরাপত্তা খাতের কর্মীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আসলে কার?

Post a Comment

0 Comments