Header Ads Widget

Responsive Advertisement

সরকারের ছয় মাসে অর্থনীতি: স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বাড়ছে একাধিক ঝুঁকি



অর্থনীতি ডেস্ক | ঢাকা

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এখনো স্বস্তিদায়ক বলা কঠিন। প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকা এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের সংকট, রাজস্ব ঘাটতি ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগ

মূল্যস্ফীতির হার আগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি; বরং পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে।

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয়ও বেড়েছে। তাই শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোতেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিনিয়োগে আস্থার সংকট

দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি দুর্বল। উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তে গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা, ঋণের খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, করব্যবস্থা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু প্রণোদনা বা বিনিয়োগ সম্মেলন যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় বিষয়।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে চাপ

গ্যাসের ঘাটতি ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও নতুন বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির উৎস বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শক্তির দক্ষ ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়নে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রয়োজন

সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবধান রয়েছে। করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসন ডিজিটাল করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যালোচনা করা রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

অন্যদিকে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির প্রভাব এখনো রয়েছে। ব্যাংক পুনর্গঠন বা পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজন হলে তার আগে সম্পদের প্রকৃত অবস্থা যাচাই, খেলাপি ঋণ আদায় এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সতর্কতা জরুরি

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব কর্মসূচি বড় পরিসরে নেওয়ার আগে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ, সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দ্বৈততা বন্ধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে কৃষকদের জন্য শুধু ডিজিটাল কার্ড চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষিঋণ, সার-বীজ, বাজারদর, বিমা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি।

সামনে যে ঝুঁকিগুলো

অর্থনীতির সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। রপ্তানি আয় দুর্বল হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক সংস্কারের ব্যয়, কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তাও অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কর্মসংস্থানকে দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন। আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপে সম্ভাবনা থাকলেও দেশের বিশাল শ্রমশক্তির জন্য শ্রমঘন শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

সব মিলিয়ে আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতিতে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবসম্মত রাজস্ব পরিকল্পনা, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

Post a Comment

0 Comments