নিউইয়র্কে জোহরান মামদানির সাফল্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতি নতুন গতি পেয়েছে। পাশাপাশি ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন বাছাইপর্বে (প্রাইমারি) ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা—ডিএসএ-সমর্থিত প্রার্থীদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জয় দলটির প্রচলিত নেতৃত্বকে চাপে ফেলেছে।
ডেমোক্র্যাটদের ভেতরেই বাড়ছে দ্বন্দ্ব
প্রগতিশীল প্রার্থীদের উত্থানকে ডেমোক্রেটিক পার্টির পুরোনো নেতৃত্ব সহজভাবে নিচ্ছে না। দলটির মধ্যপন্থী অংশের আশঙ্কা, প্রাইমারিতে প্রগতিশীল প্রার্থীরা জয় পেলেও সাধারণ নির্বাচনে তাঁরা রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে প্রগতিশীলদের দাবি, পুরোনো নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ডেমোক্রেটিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট স্বার্থ ও বিভিন্ন প্রভাবশালী লবির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।
৩৫-এর বেশি প্রগতিশীল প্রার্থীর উত্থান
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট, কংগ্রেস থেকে শুরু করে স্থানীয় সিটি কাউন্সিল পর্যন্ত ডিএসএ-সমর্থিত বা সংশ্লিষ্ট প্রগতিশীল প্রার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কলামটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে অন্তত ৩৫ জন ডিএসএ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন অথবা জয় প্রায় নিশ্চিত করেছেন। ডিএসএর বাইরে থাকা অন্যান্য প্রগতিশীল প্রার্থীদের যুক্ত করলে সংখ্যাটি আরও বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে প্রগতিশীলদের ঠেকাতে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত ‘থার্ড ওয়ে’ নামের একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে রিপাবলিকানদের মোকাবিলার পাশাপাশি ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
কেন তরুণরা বামঘেঁষা রাজনীতির দিকে ঝুঁকছেন?
প্রগতিশীল রাজনীতির উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
কলামটিতে উদ্ধৃত একটি জনমত জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ‘সমাজতন্ত্র’-এর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে সমাজতন্ত্রের অর্থ প্রচলিত রাজনৈতিক সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাঁরা মূলত বাজারব্যবস্থার বিরোধিতা না করে সম্পদের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং সুযোগের অসম বণ্টনের সমালোচনা করছেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের বড় অংশ অতি ধনী একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়াও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা নিয়েও অনিশ্চিত তরুণদের ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাচ্ছে না। কলামটিতে উল্লেখ করা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি জরিপে ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য নেই।
আরও প্রায় অর্ধেক তরুণ এখনো বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন। শিক্ষাঋণের চাপও তাঁদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনের প্রায় ৬ জন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভুল পথে এগোচ্ছে এবং বর্তমান ব্যবস্থায় তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বার্নি স্যান্ডার্সের রাজনীতি তরুণদের কাছে জনপ্রিয় কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম পরিচিত নেতা বার্নি স্যান্ডার্স। বয়স ৮৪ হলেও তরুণদের অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়গুলো তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামনে এনে আসছেন।
স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাঋণ, আবাসন এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান তরুণ ভোটারদের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও আবাসনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার সমালোচনা তাঁর রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মামদানি কেন আলোচনার কেন্দ্রে?
জোহরান মামদানি তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ দেওয়ার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছেন।
নিজেকে ‘সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু আদর্শের লেবেল নয়, বরং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এই কৌশল তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
সাম্প্রতিক একটি জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক শহরের ৬৯ শতাংশ মানুষ মামদানির কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন। একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ের একটি জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির হার ছিল ৩৭ শতাংশ।
সামনে কী হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রগতিশীলদের এই উত্থান এখনো জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী বামমুখী পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে প্রগতিশীল প্রার্থীদের সাফল্যের পাশাপাশি তাঁদের ভোটব্যাংকের সীমাবদ্ধতাও দেখা গেছে।
তবে তরুণদের অর্থনৈতিক অসন্তোষ, আবাসন ও শিক্ষাঋণের চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সম্পদের বৈষম্য—এসব ইস্যু ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রশ্নটি এখন শুধু ‘ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকান’ নয়; বরং ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেই মধ্যপন্থা বনাম প্রগতিশীল রাজনীতি—এই দ্বন্দ্ব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

0 Comments