অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা (Qusra) এলাকায় কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে ঘিরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কয়েকটি বাড়ির প্রবেশপথ আটকে রাখা, পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে ঘটনাস্থলে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুসরায় তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িকে ঘিরে বসতিস্থাপনকারীরা অবস্থান নেয়। এতে বাড়ির বাসিন্দারা বাইরে বের হতে বা প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়েন। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টাও ইসরায়েলি সামরিক বিধিনিষেধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই অবরোধের উদ্দেশ্য শুধু চাপ সৃষ্টি করা নয়—তাদের বাড়ি ও জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও এটি ব্যবহার করা হতে পারে।
সেনাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো ইসরায়েলি সেনাদের ভূমিকা। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরুদ্ধ বাসিন্দারা সেনাদের কাছ থেকে সুরক্ষা আশা করলেও কিছু ক্ষেত্রে সেনাদের বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে অবস্থান করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে বসতিস্থাপনকারীদের স্থাপনা সরানোর চেষ্টাও করেছে।
১২ আগস্ট বসতিস্থাপনকারীদের একটি অবৈধ আউটপোস্ট সরানোর সময় ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সেনারা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করলেও পরে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি কুসরায় ফিলিস্তিনি বাড়ি অবরোধকারী বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং তাদের ‘ইসরায়েলি সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে বসতিস্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে নিন্দা করার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সও কুসরার ঘটনায় জড়িত বসতিস্থাপনকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আহ্বান জানিয়েছে।
বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে পুরোনো সংকট
কুসরার ঘটনা পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলের অভিযোগকে আবার সামনে এনেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এবং এতে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ বাড়ছে।
ইসরায়েলি সরকার অবশ্য নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখে। সম্প্রতি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সেনাবাহিনী থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই পরিবর্তন বসতিস্থাপনকারীদের জবাবদিহি আরও দুর্বল করতে পারে।
সংকটের কেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা
কুসরার পরিস্থিতি দেখিয়েছে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও বসতিস্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি কতটা জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে ইসরায়েলি সেনারা কিছু বসতিস্থাপনকারী স্থাপনা সরানোর চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে সেনাদের উপস্থিতি ও আচরণ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ফলে এই ঘটনা শুধু একটি গ্রামের স্থানীয় বিরোধ নয়; বরং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের আশঙ্কা এবং সামরিক বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে চলমান বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

0 Comments