Header Ads Widget

Responsive Advertisement

৫৭% স্কুলে পাঠের সঙ্গে মিল নেই শিখন উপকরণের, মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা


ঢাকা: শ্রেণিকক্ষে শিখন উপকরণ থাকলেও তার সঙ্গে পাঠ্যবিষয়ের মিল নেই দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বড় একটি অংশে। ফলে হাতে-কলমে ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার বদলে অনেক শিক্ষার্থীকে নির্ভর করতে হচ্ছে মুখস্থবিদ্যার ওপর।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৪৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

৫৭ শতাংশ স্কুলে শিখন উপকরণে বড় অসংগতি

মাউশির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়

পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১ হাজার ৫৫৭টিতে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পাওয়া যায়নি। বিপরীতে ১ হাজার ১৯০টি বিদ্যালয়ে পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু উপকরণের ঘাটতিতে নয়; অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে উপকরণ থাকলেও তা কীভাবে এবং কোন পাঠে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানেই বড় দুর্বলতা রয়েছে।

শুধু বই পড়ে শেখায় সীমাবদ্ধ শিক্ষার্থীরা

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সঠিক শিখন উপকরণ ব্যবহার করলে কঠিন বিষয়ও শিক্ষার্থীদের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা যায়। বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম, কৃষিশিক্ষায় বাস্তব চারা বা কৃষি উপকরণ এবং পদার্থবিজ্ঞানে বিভিন্ন ব্যবহারিক মডেল শিক্ষার্থীদের বিষয় বুঝতে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু এসব উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বাস্তবে বোঝার পরিবর্তে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

শিক্ষকদের মতে, কোনো বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ে, প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হয় এবং শেখা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ঢাকা অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক

শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ব্যবহারের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় পাওয়া গেছে ঢাকা অঞ্চলে।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী—

  • ঢাকা অঞ্চলে: ৩২১টি বিদ্যালয়

  • ময়মনসিংহে: ২৪৯টি

  • খুলনায়: ১৯৪টি

  • রংপুরে: ১৯৩টি

  • বরিশালে: ১৫৩টি

  • চট্টগ্রামে: ১৩৫টি

  • রাজশাহীতে: ১৩২টি

  • কুমিল্লায়: ১১১টি

  • সিলেটে: ৬৯টি

এসব বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

উপকরণ আছে, কিন্তু ব্যবহার কতটা কার্যকর?

মজার বিষয় হলো, পরিদর্শন করা ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৯৮টিতে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার প্রয়োজনীয় কোনো না কোনো শিখন উপকরণ রয়েছে। অর্থাৎ সব বিদ্যালয়ে উপকরণের ঘাটতি নেই।

সমস্যা হচ্ছে, থাকা উপকরণটি শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা যুক্ত এবং শিক্ষার্থীদের শেখার কাজে সেটি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মাউশির প্রতিবেদনে এটিকেই গুণগত শিক্ষা-শেখানোর প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শিক্ষকসংকটেও ব্যাহত হচ্ছে মানসম্মত পাঠদান

শিখন উপকরণের পাশাপাশি শিক্ষকসংকটও শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ৩ হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকেরও ৩৮৩টি পদ খালি রয়েছে।

শিক্ষকসংকটের কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে পাঠদান বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে পাঠ প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং উপযুক্ত শিখন উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহারের জন্য শিক্ষকের হাতে সময় কমে যাচ্ছে।

১৩ বছরেও আলাদা আইসিটি শিক্ষক নেই

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি।

ফলে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৫২% স্কুলে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড ঠিক নেই

শুধু শ্রেণিকক্ষে কীভাবে পড়ানো হচ্ছে, সেটিই নয়—শিক্ষার্থীরা আসলে কতটা শিখছে, তা মূল্যায়নের ব্যবস্থাতেও বড় দুর্বলতা পাওয়া গেছে।

মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

এ ছাড়া প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী শিখন কার্যক্রম পরিচালিত হয় না

ফলে কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে সেটি সময়মতো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।

শুধু ফলাফলে নয়, ভবিষ্যৎ দক্ষতাতেও প্রভাব

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদ্যালয়ে শিখনের ঘাটতি শুধু পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলে না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মজীবনেও।

কোনো শিক্ষার্থী যদি মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয়ের মৌলিক ধারণা পরিষ্কারভাবে না পায়, পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে সেই বিষয় বুঝতে তার আরও বেশি সমস্যা হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে

মাউশির একই তিন মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

এ সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর একটি উচ্চবিদ্যালয়েই ১২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে একটি বিদ্যালয়ে ৬টি এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের একটি বিদ্যালয়ে ৫টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মাউশি এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সুপারিশ করেছে।

শিক্ষাক্রম, শিক্ষক ও উপকরণের মধ্যে সমন্বয় জরুরি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, শিখনফল অর্জনে উপযুক্ত শিখন উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু উপকরণ সরবরাহ করলেই হবে না; শিক্ষাক্রমের চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁর মতে, শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য, শিখন উপকরণের নকশা এবং বিদ্যালয় পরিবীক্ষণের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, শিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।

মূল প্রশ্ন

দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিখন উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এখন বড় প্রশ্ন হলো—সেগুলো কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখার কাজে ব্যবহার হচ্ছে?

মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, উপকরণ, শিক্ষক, পাঠ পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন—শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি দূর করা না গেলে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা আরও কার্যকর করার লক্ষ্য পূরণ কঠিন হতে পারে।

Post a Comment

0 Comments