আজ ২৭ আগস্ট নেহা ধুপিয়ার জন্মদিন। ১৯৮০ সালের এই দিনে ভারতের কোচিতে জন্ম তাঁর। ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তার মেয়ে নেহার শৈশব কেটেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে। পরে দিল্লির জেসাস অ্যান্ড মেরি কলেজ থেকে ইতিহাসে পড়াশোনা করেন। অভিনয়ে আসার আগে মডেলিং, মঞ্চ ও টেলিভিশনেও কাজ করেছেন তিনি।
যে মুকুট বদলে দেয় নেহার জীবন
২০০২ সালে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘মিস ইন্ডিয়া ইউনিভার্স’ খেতাব জয় করেন নেহা। ২৬ প্রতিযোগীর মধ্যে সেরা হয়ে তিনি ভারতের হয়ে ‘মিস ইউনিভার্স ২০০২’-এ অংশ নেন এবং সেরা দশে জায়গা করে নেন।
তবে শুধু সৌন্দর্যের কারণেই নয়, প্রশ্নোত্তর পর্বেও নজর কাড়েন নেহা। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রসঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে তাঁর বক্তব্য তখন আলোচনায় আসে।
‘জুলি’ বদলে দেয় ক্যারিয়ারের মোড়
২০০৩ সালে ‘কায়ামত: সিটি আন্ডার থ্রেট’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় নেহার। তবে এক বছর পর ‘জুলি’ সিনেমায় অভিনয় করেই ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি।
সাহসী চরিত্রে অভিনয়ের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেও এর সঙ্গে জুড়ে যায় ‘সেক্স সিম্বল’ পরিচয়। নেহার মতে, এই তকমাই পরবর্তী সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য একধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছিল।
২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘জুলি’র পোস্টার ও প্রচারণার কারণে তাঁকে নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে দেখতে শুরু করেছিলেন নির্মাতারা। অথচ তিনি চেয়েছিলেন নিজেকে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে প্রমাণ করতে।
গ্ল্যামারের বাইরে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা
‘জুলি’র পর নেহা ধুপিয়া ধীরে ধীরে চরিত্র নির্বাচনে পরিবর্তন আনেন। ‘এক চাল্লিশ কি লাস্ট লোকাল’, ‘মিথ্যা’, ‘দাসবিদানিয়া’, ‘ফাস গয়ে রে ওবামা’র মতো সিনেমায় কাজ করেন।
২০১৭ সালে ‘হিন্দি মিডিয়াম’, ‘ক্যারিব ক্যারিব সিঙ্গেল’ ও ‘তুমহারি সুলু’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে আবারও নিজের অভিনয়ক্ষমতার দিকটি সামনে আনার সুযোগ পান তিনি।
বিশেষ করে ‘তুমহারি সুলু’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিনেমার পাশাপাশি তৈরি করেন নতুন পরিচয়
বড় পর্দায় কাজের সুযোগ কমলেও নেহা কখনো পুরোপুরি বিনোদন জগত থেকে সরে যাননি। টেলিভিশন, রিয়েলিটি শো, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও ডিজিটাল কনটেন্টে সক্রিয় থেকেছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় জনপ্রিয় হয় তাঁর ‘No Filter Neha’ পডকাস্ট ও চ্যাট শো। অভিনয়ের বাইরে স্পষ্টভাষী উপস্থাপক হিসেবেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন তিনি।
বিয়ের পর মাতৃত্ব, তারপর নতুন চ্যালেঞ্জ
২০১৮ সালে অভিনেতা অঙ্গদ বেদির সঙ্গে বিয়ে হয় নেহার। একই বছর তাঁদের কন্যা মেহরের জন্ম।
মা হওয়ার পর নেহার দাবি ছিল, বলিউডে তাঁর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। সন্তান জন্মের পর কাজের প্রস্তাব কমে যাওয়ার পাশাপাশি শরীরের ওজন নিয়েও তাঁকে কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা না করে টেলিভিশন, পডকাস্ট, অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের মতো বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের কাজের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করেন নেহা।
‘রোডিজ’ বিতর্কে তুমুল সমালোচনা
নেহার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি আসে ‘রোডিজ রেভোল্যুশন’-এর সময়।
২০২০ সালে এক প্রতিযোগী জানান, তাঁর প্রেমিকা অন্য কয়েকজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে তিনি তাঁকে চড় মেরেছেন। এর জবাবে নেহা বলেন, কোনো নারী সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেটি তাঁর নিজের বিষয়; তবে কোনো পুরুষেরই তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অধিকার নেই।
নেহার বক্তব্যের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ তাঁকে ‘ফেক ফেমিনিস্ট’ বলেও আক্রমণ করেন।
পরে নেহা পরিষ্কার করে বলেন, তিনি প্রতারণাকে সমর্থন করেননি; তাঁর আপত্তি ছিল শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে।
বিতর্কের মধ্যেও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সরব
‘রোডিজ’-এ নেহাকে এর আগেও নারীর নিরাপত্তার বিষয়ে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। অডিশনে কোনো নারী প্রতিযোগী নিজেকে অনিরাপদ মনে করলে তাঁর কথা বলার অধিকার রয়েছে—এমন অবস্থানও প্রকাশ করেছেন তিনি।
এ কারণে তাঁর ক্যারিয়ারে যেমন সমালোচনা এসেছে, তেমনি নিজের অবস্থানে স্পষ্ট থাকার জন্য সমর্থনও পেয়েছেন।
২২ বছর পরও পছন্দের চরিত্রের অপেক্ষা
২০২৪ সালে নেহা জানান, হিন্দি সিনেমায় নিজের পছন্দের কাজ খুঁজে পেতে তাঁকে প্রায় ২২ বছর ধরে লড়াই করতে হয়েছে।
‘মিথ্যা’, ‘এক চাল্লিশ কি লাস্ট লোকাল’, ‘ফাস গয়ে রে ওবামা’ ও ‘আ থার্সডে’র মতো ভিন্নধর্মী কাজের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
এমনকি ২৩ কেজি ওজন কমানোর পরও নিজের পছন্দের চরিত্র না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন নেহা। তাঁর উপলব্ধি—একজন অভিনেতার শুধু কাজের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না; বরং নিজের সুযোগ নিজেকেই তৈরি করতে হবে।
এখন আর অভিনয় ‘প্ল্যান বি’ নয়
ক্যারিয়ারের শুরুতে নেহার মনে প্রশ্ন ছিল—বলিউডে সফল না হলে তিনি কী করবেন? অর্থাৎ অভিনয়কে তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত ক্যারিয়ার হিসেবে দেখতেন না।
কিন্তু দুই দশকের অভিজ্ঞতায় তাঁর সেই ভাবনা বদলে গেছে। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, রিয়েলিটি শো, পডকাস্ট, সঞ্চালনা ও লাইভ অনুষ্ঠান—বিনোদন জগতের বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে এখন তিনি নিজের অবস্থানকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেখেন।
তাঁর কাছে এখন শুধু ‘শীর্ষে থাকা’ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে এই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাটাই বড় অর্জন।
থামার পরিকল্পনা নেই নেহার
সম্প্রতি ‘৫২ ব্লু’ নিয়েও কথা বলেছেন নেহা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে নানা পরিবর্তন ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর বর্তমান অবস্থান বেশ পরিষ্কার—বিনোদন জগত থেকে এখনই সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।
‘মিস ইন্ডিয়া ইউনিভার্স’-এর মুকুট থেকে ‘জুলি’র আলোচিত চরিত্র, বিতর্কিত মন্তব্য থেকে মাতৃত্বের পর ক্যারিয়ারের চ্যালেঞ্জ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই নেহা ধুপিয়া বারবার নিজের পথ বদলেছেন। আর সেই কারণেই তাঁর ক্যারিয়ার এখন শুধু বলিউড অভিনেত্রীর গল্প নয়; বরং নিজেকে নতুন করে তৈরি করে টিকে থাকার গল্পও।

0 Comments