Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশিদের ইতিবাচক ধারণা কমেছে, জরিপে ৫১% নেতিবাচক, বাস্তবে প্রায় ৮৫%



আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে ভারতের ভাবমূর্তি একরকম নয়। নতুন এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব আগের তুলনায় কমেছে। জরিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের ৫১ শতাংশ ভারতের প্রতি নেতিবাচক বা অনুকূল নয়—এমন দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ৪২ শতাংশ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Pew Research Center বিশ্বের ৩৬টি দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত জরিপটি পরিচালিত হয়। সব দেশ মিলিয়ে গড়ে ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন, আর ৪১ শতাংশের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। তবে পার্শবর্তী দেশ হিসেবে নেতিবাচক মনোভাব সিংহভাগ যার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে! সমস্যার কারণ জ্ঞাত হলে সমাধান সম্ভব!

ভারতকে ঘিরে জনমতের পরিবর্তন ও আঞ্চলিক অসন্তোষ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কূটনীতিতে দেশটির প্রভাব ব্যাপক। তবে একই সঙ্গে প্রতিবেশী ও অন্যান্য কয়েকটি দেশে ভারতের কিছু নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ, উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশে সীমান্ত, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন; পাকিস্তানে কাশ্মীর, পানি ও নিরাপত্তা; নেপালে সীমান্ত ও ভূখণ্ড; মালদ্বীপে সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি সামরিক উপস্থিতি; শ্রীলঙ্কায় জেলে ও সমুদ্রসীমা—ভিন্ন ভিন্ন কারণে এসব দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

তবে এই চিত্রকে সরলভাবে “সবাই ভারতের বিরুদ্ধে” হিসেবে দেখা ঠিক নয়। একই দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও জনগণভিত্তিক সহযোগিতাও রয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতা হলো—সহযোগিতা ও স্বার্থের পাশাপাশি আস্থা, সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত, পানি ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে ঘিরে জনআলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের মানুষের ও রাজনৈতিক পরিসরে আলোচিত ভারতকে ঘিরে অসন্তোষের প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে—কোনো পক্ষের প্রচারণা নয়, বরং সম্পর্কের টানাপোড়েনের জায়গাগুলো বোঝার চেষ্টা হিসেবে।

বাংলাদেশে ইতিবাচক মনোভাব কমেছে

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জরিপের ফল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের আগের জরিপের তুলনায় এবার ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ১৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে মতামত দিতে অনিচ্ছুক মানুষের হারও আগের ২৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশ হয়েছে।

অর্থাৎ আগের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ এবার ভারত সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভিন্ন চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতি মনোভাবের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে।

পাকিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। বিপরীতে ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি ভারতের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির ৭৯ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন, যেখানে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে মাত্র ১১ শতাংশের। ২০২৪ সালের তুলনায় শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও কমেছে ভারতের জনপ্রিয়তা

জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ২০০৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, আর ৫০ শতাংশের অবস্থান নেতিবাচক।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন ৫১ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে সেখানে ভারতের ভাবমূর্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

ইউরোপে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া ব্রিটিশদের ৭১ শতাংশ ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানিয়েছেন।

জার্মানিতে এই হার ৬৩ শতাংশ, ইতালিতে ৫৬ শতাংশ, সুইডেনে ৫৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ৫০ শতাংশ। নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, গ্রিস, পোল্যান্ড ও স্পেনেও ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের।

আফ্রিকা ও এশিয়ায় ভারতের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাব

আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ভারতের ভাবমূর্তি বেশ ভালো। কেনিয়ায় ৭১ শতাংশ, ঘানায় ৫০ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ায় ৪৭ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।

এশিয়া–ওশেনিয়া অঞ্চলেও বেশ কিছু দেশে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। জাপান ও থাইল্যান্ডে এই হার ৫৫ শতাংশ করে। সিঙ্গাপুরে ৫১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৫০ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৪৯ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

তুরস্কে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক মনোভাব

জরিপে তুরস্কের ফলও উল্লেখযোগ্য। দেশটির ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক মতাদর্শেও পার্থক্য

কিছু দেশে মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় তুলনামূলকভাবে বামঘেঁষা বা উদারপন্থীদের মধ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে উদারপন্থী উত্তরদাতাদের ৫৪ শতাংশ ভারতের প্রতি ইতিবাচক ছিলেন, যেখানে রক্ষণশীলদের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশ। ইসরায়েলে অবশ্য চিত্রটি বিপরীত—সেখানে ডানপন্থীদের মধ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়ে মানুষের অসন্তোষের প্রধান কারণ

১. সীমান্তে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা
সীমান্তে গুলি, নির্যাতন বা বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। অনেকের প্রশ্ন—সীমান্ত নিরাপত্তা কি প্রাণহানি ছাড়াই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়?

২. তিস্তা ও অভিন্ন নদীর পানি
তিস্তা পানি বণ্টন দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়। বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশ মনে করেন, প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে পানি বণ্টনে আরও ন্যায্য ও কার্যকর সমাধান প্রত্যাশিত।

৩. বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নিয়ে ধারণা
বাংলাদেশের একটি অংশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা রয়েছে যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। এই ধারণা দুই দেশের সম্পর্কের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করেছে।

৪. শেখ হাসিনাকে ঘিরে বর্তমান টানাপোড়েন
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

৫. বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতার অভিযোগ
বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও বাংলাদেশি পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশে নানা বাধার মুখে পড়ে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। ফলে “দুই দেশের বাণিজ্য কি সমান সুবিধার?”—এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

৬. সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ও অভিবাসন ইস্যু
ভারত থেকে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিয়ে ভারতের বিভিন্ন পদক্ষেপ জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।

৭. ভিসা জটিলতা ও মানুষের যাতায়াত
চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য ভারত বাংলাদেশের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ভিসা পাওয়া কঠিন হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি সমস্যায় পড়েন—ফলে সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

৮. ‘বড় দেশ–ছোট দেশ’ মানসিকতা
অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে—দুই দেশের সম্পর্ক কি সত্যিই সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি বড় দেশ হিসেবে ভারত বেশি প্রভাব বিস্তার করে?

৯. ভারতীয় রাজনৈতিক বক্তব্য
ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে বিতর্কিত বা কঠোর বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বক্তব্যও ভারতের জনমতকে প্রভাবিত করে।

১০. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা
Facebook, YouTube ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে দুই দেশের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত, ভুল বা উসকানিমূলক তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বাড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধিতা মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি নয়।
বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও পারিবারিক যোগাযোগ—অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।

Post a Comment

0 Comments