ডেস্ক রিপোর্ট
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই শাখায় তিন ভারতীয় নাগরিকের চাকরি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকটির শাখার একটি অডিট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ওই তিন ভারতীয় নাগরিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসার পর জনতা ব্যাংকের বিদেশি শাখাগুলোর ব্যবস্থাপনা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
১২ কর্মীর মধ্যে ৩ জন ভারতীয়
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (CEO) কার্যালয়ে মোট ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। অডিট পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
বিদেশে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখায় বিদেশি নাগরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও স্থানীয় আইন-কানুন মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনুমোদন ছাড়া নিয়োগের অভিযোগটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে ওই তিন কর্মীর নিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, তাদের দায়িত্ব এবং পরবর্তীতে তাদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
ভুয়া ভাউচার ও ঋণ অবলোপনেও অনিয়মের অভিযোগ
শুধু বিদেশি কর্মী নিয়োগ নয়, জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখার অডিটে আরও কয়েকটি আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ল্যাপটপ কেনার নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা ব্যাংকের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, নথি যাচাই, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৩০৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে বড় প্রশ্ন
জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রম ঘিরে সবচেয়ে বড় আর্থিক উদ্বেগগুলোর একটি হলো প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা ঋণ আটকে থাকার বিষয়টি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন সাবেক শেখের কাছে ব্যাংকটির প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ দিরহাম, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার বেশি ঋণ দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঋণটি কীভাবে অনুমোদিত হয়েছিল, জামানতের পরিমাণ ও ধরন কী ছিল, ঋণ আদায়ে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অর্থ উদ্ধারের বর্তমান অবস্থা কী—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ঋণ খেলাপি হওয়া বা আদায়ে জটিলতা তৈরি হওয়া নিজে থেকেই অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নয়। তাই ঋণ লোপাটের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও নিরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মূলধন সংকটে ইউএই শাখাগুলো
জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে মূলধন ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলধন ঘাটতির কারণে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের দুবাইসহ চারটি শাখা বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেওয়ার পর শাখাগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি জনতা ব্যাংকের বিদেশি কার্যক্রমের আর্থিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সে প্রভাবের আশঙ্কা
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন। ফলে সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখাগুলো রেমিট্যান্স প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হিসেবে কাজ করে।
ইউএইতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলোর কার্যক্রম সংকুচিত হলে বা কোনো শাখা বন্ধ হয়ে গেলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবা ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিকল্প ব্যাংকিং চ্যানেল থাকায় এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কোন শাখা কী পরিমাণ লেনদেন পরিচালনা করে এবং গ্রাহকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর রাখা যায় তার ওপর।
এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
দুবাই শাখার অডিটে উঠে আসা তথ্যের পর কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন—
তিন ভারতীয় নাগরিককে নিয়োগের ক্ষেত্রে কার অনুমোদন ছিল?
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন কেন নেওয়া হয়নি?
নিয়োগপ্রাপ্তদের দায়িত্ব ও পারিশ্রমিক কাঠামো কী ছিল?
ভুয়া ভাউচারের অভিযোগে কত টাকা লেনদেন হয়েছে?
ঋণ অবলোপনের অনিয়মে কত অর্থ জড়িত?
প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
ইউএইর নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে জনতা ব্যাংকের বর্তমান সমন্বয় কী অবস্থায় রয়েছে?
ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে কী ধরনের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখার পরিস্থিতি বোঝার জন্য নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিদেশি শাখা পরিচালনা ও জবাবদিহির কাঠামো মূল্যায়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

0 Comments