ডেস্ক রিপোর্ট
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নয়াদিল্লি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শনিবারও রাজধানীর রাজপথে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন ছাত্র, নাগরিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। কয়েকজন আন্দোলনকারীকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় দিনেও রাজপথে বিক্ষোভ
শনিবারের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেয় সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠন আইসা (AISA)। শুক্রবারের বিক্ষোভের পর সংগঠনটির নেত্রী নেহা বোরা আন্দোলনকারীদের আবার যন্তর মন্তরে ফিরে আসার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শনিবার দুপুরের আগে থেকেই দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া ঠেকাতে সকাল থেকেই নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে বসানো হয় পুলিশি ব্যারিকেড। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি এলাকায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা কার্যকর করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মিছিল বা বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই মিছিল, পুলিশের বাধা
প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের একটি অংশ যন্তর মন্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পথে পুলিশ তাদের আটকে দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কয়েকজন আন্দোলনকারী রাস্তায় বসে প্রতিবাদ শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনজীবী কপিল সিব্বল ও প্রশান্ত ভূষণসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করে। পুলিশের বাধা ও আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
শুক্রবারও বড় বিক্ষোভ, আটক হাজারের বেশি
এর আগের দিন শুক্রবারও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। আম আদমি পার্টি, কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক ও ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা এতে অংশ নেন।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড বসানো হয়। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি ও বচসার ঘটনাও ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এক হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাট, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশী মারলেনা, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং আইসা নেত্রী নেহা বোরার নামও রয়েছে।
কেন এই বিক্ষোভ?
আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং এর নিরপেক্ষতা নিয়েও বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন প্রশ্ন তুলছে।
তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে থাকা জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তার পদত্যাগ করা উচিত। এই দাবিকে সামনে রেখেই ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক দাবির অংশ; নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
সামনে আরও বিক্ষোভের ঘোষণা
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।
তার ঘোষণা অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগঠনটির কর্মীরা দিল্লিতে এসে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করবেন। পুলিশ তাদের বাধা দিলে যেখানে আটকানো হবে, সেখানেই প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজপথে আগামী দিনগুলোতেও রাজনৈতিক ও নাগরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘটনাটির তাৎপর্য
যন্তর মন্তর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণবিক্ষোভের স্থান। সেখানে নির্ধারিত কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি বিধিনিষেধ, ব্যারিকেড, আটক ও ধস্তাধস্তির ঘটনা নতুন করে প্রতিবাদের অধিকার বনাম জনশৃঙ্খলা রক্ষার সরকারি বিধিনিষেধ—এই বিতর্ককে সামনে এনেছে।
একদিকে প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তাবিধি মেনে আইনশৃঙ্খলা এবং জনসাধারণের চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশের অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই দ্বন্দ্বই বর্তমানে দিল্লির রাজপথের উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ।

0 Comments