যুক্তরাজ্য | ডেস্ক রিপোর্ট
যুক্তরাজ্যে তরুণ বেকারত্ব কমানো এবং কর্মবাজারে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন একটি কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি। দলটির প্রস্তাবিত ‘গেট টু ওয়ার্ক’ কর্মসূচির আওতায় ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী নির্দিষ্ট বেনিফিট-গ্রহীতাদের কাজ, প্রশিক্ষণ বা কর্ম-প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কাজের উপযুক্ত হয়েও দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকা তরুণদের নিয়মিত জবসেন্টারে উপস্থিতি, ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স অথবা কর্মপ্রস্তুতিমূলক কোর্সে অংশ নিতে হবে। কর্মসূচির মেয়াদ হবে ছয় মাস। এ সময়ের মধ্যে চাকরি পেলে কর্মসূচি শেষ হবে। তবে ছয় মাস পরও কেউ বেকার থাকলে তাঁর বেনিফিট ৩০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের আইন নয়; কনজারভেটিভ পার্টির প্রস্তাবিত নীতি। দলটি ক্ষমতায় এলে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে।
কী রয়েছে ‘গেট টু ওয়ার্ক’ পরিকল্পনায়?
কনজারভেটিভদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী এমন তরুণ যারা ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের জন্য আবেদন করবেন এবং আগে টানা ছয় মাস সপ্তাহে অন্তত ১৬ ঘণ্টা কাজ করেননি, তাঁদের ‘গেট টু ওয়ার্ক’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে হতে পারে।
এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বর্তমান ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের পরিবর্তে সমপরিমাণ অর্থের ‘গেট টু ওয়ার্ক অ্যালাউন্স’ পাবেন বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি তাঁদের—
নিয়মিত জবসেন্টারে উপস্থিত হতে হবে;
ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্সে অংশ নিতে হবে;
কর্মপ্রস্তুতিমূলক কোর্সে অংশ নিতে হবে;
নির্দিষ্ট একজন ম্যানেজারের সঙ্গে কাজ করতে হবে;
চাকরি খোঁজার কর্মশালায় অংশ নিতে হবে;
ইন্টারভিউ প্রস্তুতির সেশন করতে হবে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস। এর মধ্যে কোনো অংশগ্রহণকারী চাকরি পেলে তাঁর কর্মসূচি শেষ হবে। আর ছয় মাস পরও চাকরি না পেলে বেনিফিট ৩০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কারা প্রস্তাবিত নিয়মের বাইরে থাকবেন?
কনজারভেটিভদের পরিকল্পনায় কিছু শ্রেণির তরুণকে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যাঁরা এর আগে ছয় মাস কাজ করেছেন, যাঁদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, যাঁদের অন্যের পরিচর্যার দায়িত্ব রয়েছে অথবা যাঁরা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কহীন অবস্থায় আছেন—তাঁদের এই নিয়মের আওতার বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রস্তাবটি সব তরুণ বেনিফিট-গ্রহীতার ওপর একইভাবে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়নি; নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
কেন এই পরিকল্পনা আনতে চাইছে কনজারভেটিভরা?
কনজারভেটিভ পার্টির ভাষ্য, যুক্তরাজ্যে কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের সংখ্যা কমানোই এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
দলটির হিসাবে, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। যুক্তরাজ্যে এ শ্রেণিকে সাধারণভাবে NEET—Not in Education, Employment or Training হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কনজারভেটিভদের ছায়া কর্ম ও পেনশন সচিব হেলেন ওয়াটলি পরিকল্পনাটিকে ‘কঠোর হলেও হিতাকাঙ্ক্ষী’ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তরুণদের দীর্ঘদিন বেনিফিটের ওপর নির্ভরশীল থাকার পরিবর্তে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান নিয়ম থেকে কীভাবে আলাদা?
বর্তমান ব্যবস্থায় ইউনিভার্সাল ক্রেডিট দাবিদারদের একটি ‘Claimant Commitment’-এ সম্মত হতে হয়। সেখানে তাঁদের কাজের প্রস্তুতি নেওয়া, চাকরি খোঁজা অথবা আয় বাড়ানোর মতো নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের বিষয় থাকে।
কনজারভেটিভদের প্রস্তাবিত ‘গেট টু ওয়ার্ক’ কর্মসূচি এই বিদ্যমান ব্যবস্থার তুলনায় আরও কাঠামোবদ্ধ ও কঠোর কর্মশর্ত আরোপ করতে চায়। বিশেষ করে নিয়মিত জবসেন্টারে উপস্থিতি, ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বেনিফিট কাটার প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো—ছয় মাসের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও কোনো তরুণ বেকার থাকলে তাঁর বেনিফিট ৩০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব।
দলটির যুক্তি হলো, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তরুণদের সক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিতে যুক্ত করা প্রয়োজন।
তবে দারিদ্র্যবিরোধী দাতব্য সংস্থা Trussell সতর্ক করেছে, ইউনিভার্সাল ক্রেডিটে থাকা অনেক মানুষ ইতোমধ্যে মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আর্থিক সহায়তা কমে গেলে চাকরি খোঁজা ও চাকরিতে টিকে থাকার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখানেই পরিকল্পনাটির দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসে—একদিকে কর্মসংস্থানের জন্য কঠোর শর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বেনিফিট কমানোর ফলে আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা।
বাবা-মায়ের আয়ও বিবেচনায় আসতে পারে
কনজারভেটিভ পার্টি আরও জানিয়েছে, সন্তানের বেনিফিট নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আয় ও সঞ্চয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত কি না, সেটিও তারা পর্যালোচনা করবে।
এর ফলে ভবিষ্যতে তরুণদের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ভূমিকা বাড়তে পারে—যদিও এটি এখনো একটি পর্যালোচনার বিষয়, চূড়ান্ত নিয়ম নয়।
তরুণ কর্মসংস্থানে অন্য দলগুলোর উদ্যোগ
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
লেবার পার্টির সম্মেলনে চ্যান্সেলর জন হিলি তরুণদের জন্য শুধু বেনিফিটের পরিবর্তে প্রশিক্ষণ ও বেতনসহ প্রথম চাকরির সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কল্যাণ ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেন এবং ২০২৭ সালের মার্চ থেকে ইংল্যান্ডের প্রতিটি মেয়রের জন্য ‘Local Apprenticeship Service’ ব্যবহারের সুযোগের কথা জানান।
এ ছাড়া ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস জানিয়েছে, ফেডারেশন অব স্মল বিজনেসেসের সহযোগিতায় একটি নতুন কর্মসূচিতে কোনো ছোট বা মাঝারি ব্যবসা একজন তরুণ অ্যাপ্রেন্টিস নিয়োগ করলে সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে ২ হাজার পাউন্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

0 Comments