ঢাকা | ডেস্ক রিপোর্ট
দেশের ৪১টি ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে সংগ্রহের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ৪১টি ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন নথি, হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদকের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মামলাটির তদন্ত এখন অর্থের উৎস, বরাদ্দের সিদ্ধান্ত, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন এবং অর্থের ব্যবহার—এসব বিষয় যাচাইয়ের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
৪১ ব্যাংকের কাছে কী তথ্য চেয়েছে দুদক
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ৪১টি ব্যাংকের কাছে সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টের নামে অর্থ দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ব্যাংকের বোর্ড বা নির্বাহী কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সিদ্ধান্তের কপি, অর্থ বরাদ্দ ও ছাড়ের তথ্য, সংশ্লিষ্ট হিসাব এবং লেনদেনের বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইতোমধ্যে একটি ব্যাংকের কাছ থেকে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভার কার্যবিবরণী ও উপস্থিতি তালিকার মূল কপিও চাওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দুদক এসব নথি পর্যালোচনা করে দেখতে চাইছে—কোন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলো অর্থ দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে
২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাস্টের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়ার যোগসূত্র ছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
কীভাবে সিএসআর তহবিলের অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার বিএবির সভাপতি থাকাকালে নির্বাহী কমিটির সভার নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বাইরে ‘বিবিধ’ বিষয়ে ট্রাস্টকে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টের নামে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্তগুলো কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাংকগুলো অর্থ দেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছিল কি না।
সিএসআর তহবিল নিয়ে কেন প্রশ্ন
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
দুদকের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ওই তহবিল ব্যবহারের আইনগত ও নীতিগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০০৮ সালের সিএসআর-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং ২০২২ সালের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর নীতিমালায় অর্থ ব্যয়ের নির্ধারিত ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে ট্রাস্টের নামে এ ধরনের অর্থ প্রদানের সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
এ কারণে শুধু অর্থ কোথায় গেছে তা নয়, কেন দেওয়া হয়েছিল এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল—তদন্তে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাস্টের কার্যক্রম নিয়েও তদন্ত
দুদকের অনুসন্ধানে ট্রাস্টের কার্যক্রম ও সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়ে নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদনও ছিল না বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ এবং সংশ্লিষ্ট নথি, আইনগত অবস্থান ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় নির্ধারিত
মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন। ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে ওই তারিখ নির্ধারণ করেন।
ফলে ৪১টি ব্যাংকের কাছ থেকে সংগৃহীত নথি ও আর্থিক তথ্য তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

0 Comments