Header Ads Widget

Responsive Advertisement

সাত বছরেও হয়নি আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা চূড়ান্ত বিচার: দ্রুত রায় বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর


পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আশ্বাস; বুয়েটে আবরারের নামে হল ও গড়াই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবিও গুরুত্ব পেল

নিজস্ব প্রতিবেদক | জাতীয় ডেস্ক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন আবরারের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সেই দাবি ও প্রত্যাশার কথা শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে আবরার ফাহাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

আবরারের পরিবারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই সাক্ষাৎ এমন এক সময়ে হলো, যখন হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পরও দণ্ডিতদের আপিলের শুনানি ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা চলছে। একই সঙ্গে আবরারের স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মারক স্থাপন এবং দেশের অতীতের গুম-খুনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

পরিবারের প্রধান দাবি—দ্রুত সম্পন্ন হোক চূড়ান্ত বিচার

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ জানান, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের অনুরোধ জানিয়েছিলেন এবং সেই সুযোগ পেয়েছেন। সাক্ষাতে তিনি মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর প্রত্যাশা, আইনের মধ্যে থেকে মামলাটির নিষ্পত্তি দ্রুত করা হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে রায় কার্যকরের পথে আর অযথা বিলম্ব হবে না।

পরিবারের এই দাবি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, হারানো সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো শিক্ষার্থী যেন একই ধরনের সহিংসতার শিকার না হয়, সেই নিশ্চয়তার প্রশ্ন।

তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তাই দ্রুত শুনানির উদ্যোগের পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আসামিপক্ষের আইনগত অধিকার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আবরার হত্যা মামলার বিচারিক অগ্রগতি

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে নির্যাতনের শিকার হন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। পরদিন তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

মামলার বিচার শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। ফলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো বাকি।

সাত বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকায় পরিবারের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। এ অবস্থায় মামলাটির শুনানি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার দাবি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ব্যবস্থাপনা এবং আদালতের কার্যতালিকায় মামলাটির অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আবরারের নামে বুয়েটে হল করার প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে আবরারের ভাই আবরার ফাইয়াজ বুয়েটে তাঁর ভাইয়ের নামে একটি হল করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তাবটি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।

আবরারের নামে হল প্রতিষ্ঠার দাবি তাঁর স্মৃতিকে শিক্ষাঙ্গনে সংরক্ষণের একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আবরার ফাহাদের নাম শুধু একটি স্মারক হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি সম্মানের আলোচনাতেও যুক্ত হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে নির্যাতন, ভয়ভীতি কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়বে না।

গড়াই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবিও সামনে

সাক্ষাতে পরিবারের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিও জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সেতুটি আবরার ফাহাদের নামে নামকরণের কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে এবং আবরারের স্মৃতিকে জনপরিসরে সংরক্ষণের একটি স্থায়ী নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রকল্পের স্থান, ব্যয়, সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন এবং নির্মাণের সময়সূচি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

অতীতের গুম-খুনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার আহ্বান

আবরার ফাইয়াজ সাক্ষাতে গত ১৭ বছরে গুম, হত্যা ও অন্যান্য সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করে একটি তালিকা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

এ উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত হবে, ভবিষ্যৎ তদন্তে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রক্রিয়া আরও সুসংহত করা সম্ভব হবে।

তবে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনার তথ্য যাচাই, ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য গ্রহণ, প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণ এবং অভিযোগ ও প্রমাণিত ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি। নির্ভরযোগ্য নথিভুক্তকরণই এ ধরনের উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি।

বিশ্লেষণ: আবরার ফাহাদ—ন্যায়বিচার, জাতীয় স্বার্থ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শিক্ষাঙ্গলে সহিংসতা, ভিন্নমতের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—একজন শিক্ষার্থী কি নিজের মত প্রকাশের কারণে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার হলে ভুক্তভোগী কতটা সুরক্ষা পাবেন এবং অপরাধের বিচার কত দ্রুত নিশ্চিত হবে?

প্রথমত, দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার রাষ্ট্রের প্রতি জনআস্থা জোরদার করে। আলোচিত কোনো মামলায় দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাই আইনগত প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ণ রেখে মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি ও নিষ্পত্তি এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাঙ্গলে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর জবাবদিহি প্রয়োজন। শুধু অপরাধের বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আবাসিক হলের নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তার বা ভয়ভীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

তৃতীয়ত, আবরারের স্মৃতি সংরক্ষণকে শিক্ষামূলক উদ্যোগে রূপ দেওয়া যেতে পারে। তাঁর নামে হল বা সেতু নির্মাণের মতো প্রস্তাবের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার, সহনশীলতা, জাতীয় স্বার্থ ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ নিয়ে আলোচনা এবং গবেষণার সুযোগ তৈরি করা হলে স্মৃতির তাৎপর্য আরও বিস্তৃত হবে।

চতুর্থত, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্ভরযোগ্য নথি তৈরি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গুম, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সংরক্ষণ করা হলে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নীতিগত সংস্কারের ভিত্তিও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায়বিচার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান যা-ই হোক, অপরাধের বিচার হতে হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। একইভাবে, ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কারও ওপর সহিংসতা চালানোর সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

Post a Comment

0 Comments