প্যারিস | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফ্রান্সে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শুরু করা বিক্ষোভ ক্রমেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা খাতে শিক্ষক ও কর্মী সংকট, অতিরিক্ত ভিড়, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শুক্রবার, ২ অক্টোবর, দেশটির প্রায় ৪০০টি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সময়ে বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
কী নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা কম। কোনো কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের তীব্র গরমের সময় অনেক শ্রেণিকক্ষে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা, পুরোনো ভবন, অপর্যাপ্ত শৌচাগার এবং শিক্ষা উপকরণের ঘাটতির কথাও শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছে।
স্ট্রাসবুর্গের এক ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, তাদের শ্রেণিতে প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকে এবং গরমের সময় শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। তার ভাষ্যে, কিছু ভবনে রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা ও পর্যাপ্ত সম্পদের ঘাটতিও রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মূল দাবির মধ্যে শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থায়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মী নিয়োগ এবং নিরাপদ ও উপযোগী শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো রয়েছে।
বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ
আন্দোলন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পাশাপাশি কিছু এলাকায় সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্যারিসের দুটি হাইস্কুলের প্রবেশপথে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। স্ট্রাসবুর্গ ও অন্যান্য শহরেও গাড়ি বা অন্যান্য স্থাপনায় আগুন এবং ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। মার্সেইতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ফায়ারওয়ার্কস ছোড়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী এসব সহিংস কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল—এমন কোনো সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
৪০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জফ্রে জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার প্রায় ৪০০টি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। দেশটিতে মোট হাইস্কুলের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭০০ হওয়ায় বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মোট সংখ্যার একটি অংশ। কিছু এলাকায় অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করার কথাও জানানো হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই ব্যাহত হচ্ছে না; শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রায় ২ হাজার আটক, বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক
ফ্রান্সের আইনমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ২ হাজার মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী অভিভাবকদের সন্তানদের বিক্ষোভস্থলে না পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাধ্যমে সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে তার মেরামত ব্যয়ের দায় অভিভাবকদের ওপর দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ধরনের বক্তব্যের পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়েও মানবাধিকার, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠেছে
বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করেছে।
স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশি আচরণ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বাহিনীর অভ্যন্তরেও তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে আন্দোলনের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও পৃথকভাবে নজরদারি ও তদন্তের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক বিতর্কও বাড়ছে
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার বিক্ষোভের পেছনে উগ্র-বামপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তারা সহিংসতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে ছিল বলে জানিয়েছে।
এ কারণে আন্দোলনের প্রকৃত চালিকাশক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও শিক্ষার্থীদের ঘোষিত দাবিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষা অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এক বিষয়, আর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রশ্ন আরেকটি বিষয়—দুটিকে একইভাবে বিবেচনা করলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

0 Comments