ঢাকা | কূটনৈতিক ডেস্ক
বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বা ‘দাবার বোর্ড’ হতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা, সহযোগিতা ও অংশীদারত্বে আগ্রহী; তবে এসব সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-এর ‘নতুন করে লেখা এক বিশ্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
‘নিজেদের শর্তে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক’
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা, সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব করতে প্রস্তুত। তবে কোনো দেশের স্বার্থে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে না—এমন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার ভাষায়, বাংলাদেশ অন্য খেলোয়াড়দের খেলার জন্য ‘দাবার বোর্ড’ হতে চায় না; বরং নিজেদের শর্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের স্বার্থ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, সহযোগিতা কিংবা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের জনগণের প্রয়োজন ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তায় বৈচিত্র্যের ওপর জোর
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংকটের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শামা ওবায়েদ উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া দুটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন।
এর মধ্যে তিনি একটি হিসেবে অপ্রত্যাশিত জ্বালানি সংকট এবং অন্যটি উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাস ও কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর বিষয়টি তুলে ধরেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নতুন উৎস, নতুন ক্ষেত্র ও সরবরাহের বৈচিত্র্যের দিকে নজর দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। দেশের নিজস্ব গ্যাস ও এলএনজি উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহে বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটেও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা
বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়টিও উঠে আসে।
শামা ওবায়েদ বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং এর ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বিষয়টিতে সহযোগিতাপূর্ণ ও সংবেদনশীল অবস্থান বজায় রেখেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল প্রত্যাবাসনের জন্য অংশীদার, বন্ধু, উন্নয়ন সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানের তাৎপর্য
শামা ওবায়েদের বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়েছে—
১. জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিষয় করা:
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি জনগণের প্রয়োজনকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়েছে।
২. বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব:
কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা, সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব বজায় রাখার বার্তা রয়েছে।
৩. জ্বালানি নিরাপত্তা:
আঞ্চলিক সংঘাত বা বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় জ্বালানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্ভাবনা:
দেশের গ্যাস, এলএনজি এবং সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়টি জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
৫. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন:
বাংলাদেশ একদিকে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, অন্যদিকে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান জানিয়েছে।
বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে বাংলাদেশের বার্তা
এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সম্মেলনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

0 Comments